বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পাঠ প্রতিক্রিয়া : কে নেয় কার খোঁজ! যে নেয় তাকে ধন্যবাদ



সজল ছত্রী::
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার আলাদা কোনো ভাবালুতা নেই। সোমত্ত যুবক হওয়া সত্তে¡ও আমার বাবা মুক্তিয্ুেদ্ধ যাননি। বৃদ্ধা মা, দুই বোন, স্ত্রী, দুই মেয়ে আর সদ্যজাত পুত্রসন্তানসহ তিনি লুকিয়ে ছিলেন পাহাড়ের গুহায়। মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হলে ছুটে আসতেন লোকালয়ে, খাবার দাবার সংগ্রহ করে আবার চলে যেতেন পাহাড়ে। এলাকায় তখন বিহারিরাজ। বিহারিরা ব্যাপক ক্ষমতাশালী। মাত্র কদিন আগেও তারা সবাই মিলেমিশে থাকত। মারাদাঙ্গাও ছিল নিজেদের মধ্যে, নিজেরাই মেটাতো সেটা। আজকের তেতো কথা কাল হয়ে যেত মিষ্ট। কিন্তু এখন তাদের মুখে সে মিষ্টতা নাই। দূরে কোথাও বম্পিং হলে তারা বলে, ইন্দিরা-মুজিবের বিয়ে হচ্ছে, এই দেশ আর হিন্দুদের নাই।
পরিস্থিতি আরো কিছুটা থিতিয়ে এলে মনে সন্দেহ আর ভয় নিয়েই ফের ঘরে ফিরে তারা। ফিরে এসে দেখা গেল খাকি পোশাকের মানুষও ভালো ব্যবহার করছে। বিহারিরা পালিয়েছে। যারা আছে তাদেরও সে ঔদ্ধত্য নাই। বুঝা গেল পাকিস্তান আমলের অবসান হয়েছে। এখন যাদের দেখা যাচ্ছে তারা মিত্রবাহীনি, মানে ইন্ডিয়ার বাহিনী। কদিন পর মিত্রবাহিনী চলে গেলে ফিরে আসে পলাতক বিহারিরাও। আবার তেলে-জলে শুরু হয় সংসার।
সীমান্তবর্তী এলাকা, হিন্দুপ্রধান। যুদ্ধের শুরুতেই তাই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ পাড়ি জমিয়েছিল ভারতে। অনেক বছর আগে দেশভাগ হয়ে গেলেও তখনো তারা ভারতকেই মনে করত নিজের দেশ। মনে করত বিপদে পড়লে ভারত অবশ্যই এগিয়ে আসবে। তাই ‘গÐগোল’ শুরু হলে তারা ভারত পাড়ি দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি শৈশব থেকেই শুনে আসছি, মুক্তিযুদ্ধের বছরকে এইসব জনপদে ‘গÐগোলের বছর’ বলে চিহ্নিত করা হত। সময়ের পরিক্রমায় এটি এখন ‘সংগ্রামের বছর।’ আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, এটি মানুষকে শিখিয়ে দিতে হয়নি।
নয়মাস পর শরনার্থীশিবির থেকে নিজের ঘরে ফেরার সময় যে অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিওে সীমান্তবর্তী মানুষ তা একেবারে তিক্ত নয়, আবার খুব মিষ্টও নয়। যুদ্ধ তাদের জানিয়ে দেয়, ভারত আর তাদের দেশ নয়, তারা নতুন একটি দেশের বাসিন্দা, ভারত আর তাদের কখনো নেবে না। নিলেও তাদের দিকে বড়জোর ছুঁড়ে দেবে ভিক্ষার অন্নটুক।
ফিরে এসে লুট হওয়া ঘর, বিধ্বস্ত সংসার আবার গোছানো শুরু হয়। ভারতের শরণার্থীশিবিরে ক্ষুধা ও অসুখে যারা মরেছে, তাদের কখনো মনে এলে দেশভাগ করা নদী অথবা অনতিদূর পাহাড়ের দিকে তারা চেয়ে থাকে। সেই পাহাড়, সেই স্বজন, কিছুই আর তাদের নয়, হাতের নাগালের সেই দেশটি ভিন্নদেশ। সেটি আর তাদের দেশ নয়, ইন্ডিয়া।
মুক্তিযুদ্ধই তাদের প্রথম দেশ চিনতে বাধ্য করেছে। দেশ তাদের হয়েছে, তারাও হয়েছে দেশের।

২.
মুক্তিযুদ্ধের একদশকেরও বেশি সময় পরে যেখানে আমার জন্ম, মুর্হূমুর্হূ যুদ্ধ হয়েছে সেখানে। যুদ্ধ শেষে ঘরে ফেরার পথে পাহাড়ে পাহাড়ে পুঁতে রাখা স্থলমাইনে পঙ্গু হতে হয়েছেন অনেকে। এ এলাকার যুদ্ধেই শহিদ হয়েছেন সাত বীরশ্রেষ্ঠের অন্যতম সিপাহী হামিদুর রহমান।
আমি সর্বোতভাবেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। তবে আমার বাবা যুদ্ধে যাননি বলে আমার বিশেষ কোনো খেদ নেই। আমাদের এলাকাতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। আমি সুযোগ পেলে তাদের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকি। অনুমান করার চেষ্টা করি, কেন তারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন? কতটা স্পৃহা, কতটা মরণপণ নিয়ে গিয়েছিলেন? আমি অনেক প্রশ্নের উত্তর পাই, অনেক উত্তর পাই না। যে প্রশ্নের উত্তর আমি পাই, সে উত্তরে আমি তাদের সম্মান করি। জানি এমন সুযোগ সবার জীবনে আসে না। তারা সে মহৎ সম্মানের অধিকারী, তারা বীর। আর যে প্রশ্নের উত্তর আমি পাই না, তা আমি বয়ে বেড়াই। দেশ যত অরক্ষিত হতে থাকে, বসবাস-অযোগ্য হতে থাকে, আমার জিজ্ঞাসা তত বাড়তে থাকে। সাতচল্লিশে একবার দেশভাগ হয়েছিল, আরো একবার একাত্তরে। এই দুই ভাগে মৌলিক তফাৎ কতটুকু? কোন জায়গায়, কোন বাস্তবতায়?
এসব পাহাড়ি অঞ্চলে পাকিস্তানী বাহিনী এসে যা করেছিল সেই দৃশ্যেরই পুনরাবৃত্তি রাঙামাটি-বান্দরবানে আমাদের বাহিনী করছে কিনা আমি তাও ভাবি।
চা বাগানগুলোতে তখনো ইংরেজ আধিপত্য চলছিল। কোথাও ইংরেজ ব্যবস্থাপক, কোথাও মালিক। দীর্ঘদিনে তাদের সাথে প্রভূ-ভৃত্য হলেও একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে। ঘর থেকে বোন বা মেয়েকে তুলে নিয়ে যৌনদাসীতে রূপান্তরিত করা, ইচ্ছে হলে কাউকে মেরে গাছে ঝুলিয়ে দেয়ার মতো নৃশংস তামশা কেউ তাদের সাথে করতে পারে চা বাগানের মানুষ তা কল্পনাও করতে পারেনি। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর তাদের সাথে তা-ই ঘটতে থাকে। তবু তারা কাজ করে যায় পাহাড়ে পাহাড়ে, কাজ না করলে তো না খেয়েই মরতে হবে।

৩.
আমি অপূর্ব শর্মার ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ নামের অনুসন্ধানী বইটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি। কয়েকটি পর্ব ফিরে ফিরে পড়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে দেশের সীমান্তবর্তী চা বাগানগুলোতে দেদারসে গণহত্যা হয়েছে। আমি জানি না যারা আজকাল মুক্তিযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তারা কখনো এসব শহিদদের গুণতিতে নিয়েছেন কিনা। তবে আমি নিশ্চিত ‘সংগ্রামের বছরে’ স্বাধীনতার লাল সূর্য জেগে ওঠার আগে সবুজ চায়ের দেশে যত রক্ত ঝরে গেছে কাগজে-কলমে তার সঠিক হিসাব আর কখনো করা সম্ভব হবে না।
অপূর্ব শর্মা অনন্য চেষ্টা করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করলে প্রতিটি সবুজ পাহাড়ের আড়ে আড়ে কত লাল রক্ত ঝরেছিল তা তিনি তুলে এনেছেন অত্যন্ত যতœ করে। তুলে এনেছেন নিরীহ মানুষগুলোর অসহায়ত্ব, বঞ্চনা আর স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও তাদের প্রতি তুমুল অবহেলার এক তীর্যক চিত্র। ভাষা না হয়ে যদি শুধু পরিসংখ্যানও থাকতো, তবু নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে প্রাসঙ্গিক গ্রন্থগুলোর মধ্যে এটি একটি অনন্য সংযোজন হতো।
আলো এখন পৌঁছে যাচ্ছে ঘন পাহাড়ের আড়ে আড়েও। সেই আলোতে এই বইটির মাধ্যমে চা বাগানের নতুন প্রজন্ম অন্তত তাদের পূর্বসূরিদের আত্মদানের কথাটুকু জানতে পারবে, মন্দ কি?
ভুল কিনা আমিও নিঃসন্দেহ নই, তবে গ্রন্থটিতে কিছু তথ্যগত ভুল আছে বলে আমার মনে হয়েছে। অতিসামান্যই, তবে আলোচনার সুযোগ আছে বলে আমি উল্লেখ করতে চাই। আশাকরি লেখক পরবর্তী সংস্করণে সেগুলোকে আরো যথাযথ করবেন।
গ্রন্থের শেষাংশে গ্রন্থ প্রণেতা প্রতিটি চা বাগানের নাম উল্লেখ করে শহিদদের একটি তালিকা সংযুক্তি করেছেন। চা বাগানগুলোর অবস্থানের একটি তালিকার পাশাপাশি তিনি চা বাগানের অধিবাসীদের সম্প্রদায়গত বিভিন্ন পদবি এবং তাদের কাজেরও একটি তালিকা দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তবে চা বাগানের তৎকালীন পারিপার্শ্বিকতা বুঝে ওঠার জন্য এটি কার্যকর বলেই মনে হয়েছে। এটি গ্রন্থকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু মূল্যবান এই সংযোজনের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে গ্রন্থের কোথাও সেরকম কোনো ইঙ্গিত নাই। এমনকি ভূমিকাতেও উল্লেখ হয়নি এমন কোনো বিষয়।
ভূমিকার আরো দুটি ঘাটতি নিয়ে বলতে চাই।
এক. গ্রন্থাকার চা শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘… আধুনিকতার উম্মেষপর্বে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সেভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেনি প্রান্তবর্তী এলাকার বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠি।’
প্রথমত আধুনিকতার উম্মেষপর্বে বাঙালির অধিকার আদায়ের কোনো আন্দোলন ছিল কিনা তা নিয়েই আমার প্রশ্ন আছে। ভাষা আন্দোলন ছাড়া আর কোন আন্দোলনটি বাঙালির আন্দোলন তা আমার বোধগম্য নয়। এই আন্দোলনেও সম্পৃক্ত হবার কোনো সুযোগ চা শ্রমিকদের নেই। কেননা তারা বাঙালি নন, বাংলা তাদের ভাষা নয়।
দুই. তিনি লিখেছেন :‘… তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই পাল্টে যেতে থাকে। দেশভাগ পরবর্তীকালে পাক সরকারের দুঃশাসনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে চা শ্রমিকদের মধ্যেও দ্রোহি চেতনার স্ফূরণ ঘটে। অনেক স্থানে চা শ্রমিকরা শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বাঙালির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায় কৃষ্ণাঙ্গ এই জনগোষ্ঠি।’
প্রথমত. পাক সরকারের দুঃশাসনের রেশ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে চা বাগান এলাকাতে তেমটি পৌঁছায়ইনি। কিছু বাগানের মালিকানা নিয়েছে পাকিরা, সেখানে যথেচ্ছাচারও চলেছে। তবে সম্ভবত পাকিরা চা বাগান সামাল দেবার মতো যথেষ্ট কাবিল না হওয়ায় বাগানগুলোর ভার ইংরেজদের হাতেই থেকে যায়। আর দেশি অর্থাৎ পাকি মালিকরা যে শোষণ চালাতো তার দায়ভার পাকি দুঃশাসনের ওপর দেয়া যায় না। সেটি এখনো বর্তমান। সে বৈষম্য শ্রেণীর, বাণিজ্যের। হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে তার রকমফের হয় সামান্যই। বর্তমান বাস্তবতায় বলতে পারি, বাংলাদেশেও তার রকমফের হয় না। তাদের এখনো একইরকম দমন করা হয়, একই রকম শোষণ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে যারা লড়াই করেছেন তারা করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর রুখে দাড়িয়েছে। এই যুদ্ধ পাকিস্তানের সাথে ছিল না, ছিল নিজের অস্তিত্বের স্বার্থে।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি হচ্ছে, লেখক চা শ্রমিকদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বলতে গিয়ে সম্ভবত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চা শ্রমিকরা হচ্ছে এই জনপদেরই মিশ্র জনগোষ্ঠি। এককালের বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অধিবাসী, বড়োজোর নেপাল থেকে এসেছেন তারা।

৪.
প্রায় প্রতিটি চা বাগানে পাকি ও দোসরদের চালানো নৃশংসতা ওঠে এসেছে ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ বইটিতে। এতো সংখ্যক তথ্য তুলে আনা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। গ্রন্থ প্রণেতা চেষ্টা করেছেন প্রতিটি ঘটনাকে পৃথক শিরোনামে সাজাতে। চেষ্টা করেছেন কেন আজো অবহেলা আর পেছনে পড়ে থাকা চা জনগোষ্ঠির ওপর এমন অত্যাচারের প্রয়োজন পড়েছিল পাকিদের সেই রহস্য উদঘাটনের?
লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে শুরু করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের প্রায় প্রতিটি চা বাগানেই ছিল পাকবাহীনির ক্যাম্প। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, সীমান্তবর্তী ও হিন্দু প্রধান এলাকা হওয়ায় চা বাগান টার্গেটে পড়ে পাকিদের। চা বাগানগুলো টিলাঘেরা হওয়ায় এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া ছিল পাকিরা। মুক্তিবাহিনী যাতে চা শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে আর যোগাযোগ হলেও চা শ্রমিকরা যেন তাদের কথায় প্রভাবিত না হন এই ভয়টুকু ছড়িয়ে দিতেই জল্লাদরূপে চা বাগানে হাজির হয় তারা। তাদের সহযোগিতা করে এদেশিয় দোসররা। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে মুক্তির আহŸান গিয়ে পৌছে যায় চা বাগানে। বুঝে হোক আর না বুঝে হোক একদমই নীরিহ একজন শ্রমিককে যখন পাকিরা গুলি করে, মৃত্যুর আগে সে চিৎকার করে বলার চেষ্টা করে ‘জয় বাংলা’। সীমান্ত পারাপারে মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকম সহযোগিতা করে তারা।
যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই চা শ্রমিকরা বুঝে ফেলে ‘মুক্তি’রা যা চায় তা ন্যায়, আর পাকিরা যা চায় তা অন্যায্য। চা শ্রমিকরা সবসময়ই ন্যায়ের পক্ষ দিয়েছে।
আমি যতদূর জানি, মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই চা বাগানগুলোতে বামদলগুলোর প্রভাব ছিল কিছু না কিছু। গ্রন্থে তা ওঠে আসেনি। এটিও একটি কারণ চা শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হবার ক্ষেত্রে। চা শ্রমিকদের মধ্যে ময়দানের অনেক মুক্তিযোদ্ধাও আছেন, শহিদ আছেন।

৫.
শুধু চা জনগোষ্ঠি নয় মুক্তিযুদ্ধে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় চা বাগানে বসবাসকারী অন্যান্য মানুষকেও। বেশ কজন হিন্দু চা বাগান মালিক ও ব্যবস্থাপককে প্রাণ দিতে হয়। তাদের পরিবারকে জিম্মি করা হয়, মহিলাদের বারংবার ধর্ষণ ও লাঞ্ছিত করা হয়। অনেকে আত্মহত্যা করেন, অনেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে বেছে নেন নিভৃত জীবন। ধর্ষণ, হত্যা ও লাঞ্ছনা থেকে রেহাই পাননি বাঙালি মুসলমান মালিক-কর্মচারিরাও।
গ্রন্থে মংলু ঘাটুয়ার নামের এক মুক্তিযোদ্ধার কথা ওঠে এসেছে। উদনাছড়া চা বাগানের এই শ্রমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হলেও শ্রমিকবেশে তথ্য সংগ্রহের সুবিধা নিয়ে বারবার দেশের ভেতরে আসতেন। একদিন ধরা পড়েন, যেভাবে তাকে হত্যা করা তা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
খÐে খÐে সাজানো গল্পগুলোকে একত্র করলেই মুক্তিযুদ্ধে চা বাগানগুলোতে কী বিভৎসতা নেমে এসেছিল, কেমন ছিল তখনকার চারপাশ তা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
প্রার্থনারত পুরোহিতের ওপর আচমকা নেমে আসছে মর্টার সেল, গুলি কম খরচ করার জন্য পাকিরা একলাইনে দাঁড় করিয়ে এক গুলিতেই মেরে ফেলছে যত সম্ভব বেশি শ্রমিককে। বিহারী ও পাকিস্তানপন্থি বাঙালিরা যাকে ইচ্ছে ধরিয়ে দিচ্ছে পাকিবাহীনির কাছে। যাকে একবার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে আর ফিরছে না। রাতে বিরাতে এসে ঘরের মহিলাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ক্যাম্পে… এমন কষ্টকর দৃশ্য তুলে এনেছেন অপূর্ব শর্মা।
দেশের অনেক সনাক্তকৃত বধ্যভূমি পড়ে আছে অবহেলা অনাদরে। চা বাগানের বধ্যভূমিগুলোর অবস্থাও করুণ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোটবড় আরো অনেক বধ্যভূমি যা সনাক্ত হয়নি। একাত্তরে প্রায় প্রতিটি চা বাগানই হয়ে ওঠে একেকটি বধ্যভূমি।
এখানে আরো একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করব। অপূর্ব শর্মা পাত্রখোলা চা বাগানে বম্পিংয়ের যে ঘটনাটি তুলে এনেছেন সেটি সম্ভবত তথ্যদাতাদের স্মৃতিবিভ্রান্তির শিকার। এই বাগানের পাশেই ধলই চা বাগানে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান। সেখানে আজো তার স্মৃতিস্তম্ভ আছে।
পাত্রখোলা বাগানে যে বম্পিংটি হয়েছিল সেটি পাকিস্তানী বাহিনীর ছিল না, ছিল ইন্ডিয়ান বাহিনীর শেল। এবং তাতে নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন পাকিস্তানের সমর্থক বিহারি, যারা চা বাগানে অবস্থান করছিলেন চা ফ্যাক্টরিসহ অন্যান্য মালামাল লুটের জন্য। তাদের অনেক সদস্যের কারণেই তটস্থ থাকতে হতো এলাকাবাসীকে। যদিও নিহতদের মধ্যে অন্তঃসত্ত¡া নারী ছিল বলে যে উল্লেখ করেছেন লেখক, সেটি সত্য।
মূল কথা হচ্ছে মুক্তি বা পাকি বাহিনী সীমান্ত ঘেঁষা এসব এলাকায় হেলিকপ্টারে অপারেশনের সুযোগ পায়নি। এটি করেছে যুদ্ধের শেষভাগে মিত্রবাহিনী।

৬.
কথাই শুধু লিখা যায়, দুঃখকে মুদ্রিত করা যায় না। স্মৃতিকেই ইতিহাস বলে জানানো হয়, ক্ষরণটুকু চিত্রিত করা যায় না। ‘চা বাগানে গণহত্যা ১৯৭১’ বইটি স্বাধীনতার বেদিমূলে চা বাগানের বাসিন্দা মুক্তিকামী প্রতিটি মানুষের রক্তক্ষরণ, বেদনা দান, অসহায়ত্বের অনন্য দলিল।
সীমাবদ্ধতার কথা যদি বলা হয়, তবে বলব, এই সীমাবদ্ধতা চিরকাল থাকবে। কেননা প্রতিটি মানুষকে যদি তার নিজস্ব জগতের নায়ক মনে করা হয়, একেকটি মৃত্যুই তাহলে একেকটি কালজয়ী মহাকাব্য। একজনের পক্ষে সকল কিছু লিখে ফেলা সম্ভব নয়।
আবারো অপূর্ব শর্মাকে ধন্যবাদ জানাবো, বেদনাগুলোকে একত্র করার জন্য।
শেষ করব জাগছড়া চা বাগানের শ্রমিক ভরত কালিন্দি ও নারায়ণ গোয়ালার ছেলে সুন্দর কালিন্দি ও মধুবন গোয়ালার কথা দিয়ে। শেখ মুজিবের দলকে সমর্থন কারণে ভরতকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আর বাগানের সর্দার হওয়ার কারণে নারায়ণ গোয়ালাকে হত্যা করা হয় মানুষের মধ্যে ভয় জাগাতে।
ভরতের ছেলে সুন্দর কালিন্দি বলেন, ‘বাবার লাশটি পর্যন্ত আমরা পাইনি। শেখ মুজিবের দল করার কারণেই হত্যা করা হয় বাবাকে।’ তার সাথে যুক্ত করে মধুবন গোয়ালা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অনেক শহিদ পরিবার বঙ্গবন্ধুর চিঠি ও সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু আমরা কিছু পাওয়া তো দূরের কথা, একদিন এসে আমাদের খোঁজও নেয়নি কেউ।’
এখন রক্তের ওপর টিকে থাকার খেলা চলছে দেশজুড়ে। দেশ তখন পরাধীন ছিল, পরাধীন দেশে বেঁচে থাকাও তো মৃত্যু, আর এখন? স্বাধীন দেশেও স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নাই।
নষ্ট রাজনীতি, ভ্রষ্ট মানুষের সময়ে কে নেয় কার খোঁজ! অপূর্ব শর্মা নিয়েছেন তাকে সোজাসাপ্টা ধন্যবাদ।

  •