বৃহস্পতিবার, ২ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ভেঙে পড়েছে পরীক্ষাব্যবস্থা 



অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য::
গত দশ বছর ধরে দেশে যে পঞ্জি অনুযায়ী পাবলিক পরীক্ষা হয়ে আসছে তা করোনাকালে ‘তছনছ’ হয়ে গেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিভাবে এই পরীক্ষাগুলো নেয়া হবে তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হলেও এ বিষয়ে এখনও কোনো দিশা দেখাতে পারেনি শিক্ষা প্রশাসন। এনিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে মহাদুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে।
প্রতিবছর ১ ফেব্রæয়ারি মাধ্যমিক ও সমমান, ১ এপ্রিল উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান, জুনে অর্ধ বার্ষিক, নভেম্বরে জেএসসি-জেডিসি, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বার্ষিক পরীক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু করোনাভাইরাসে চলমান সাধারণ ছুটির কারণে পরীক্ষাগুলো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরের মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ আটকে গেছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্কুলগুলোর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। বার্ষিক পরীক্ষা এবং জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সিলেবাস কিভাবে হবে সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে আসছে।
একইসঙ্গে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী চলতি বছর আর শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যাবে না। বিশেষ করে ক্লাসরুমে পাঠদান। এই পাঠদান না হওয়ার ফলে চলতি বছরের পরীক্ষাগুলো যেমন হুমকিতে পড়েছে তেমনি আগামী বছরের অর্থাৎ ২০২১ সালের মাধ্যমিক ও সমমান এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও ঝূঁকিতে পড়বে। কারণ ক্লাস না হওয়ায় সিলেবাস কমিয়ে যদি আগামী নভেম্বরে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নেয়া হয় সেক্ষেত্রে আগামী বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে কি হবে? মাধ্যমিক পরীক্ষাতো ফেব্রæয়ারিতে হবে। মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য যে ক্লাস হওয়া দরকার সেটি পরীক্ষার আগের বছর হয়ে থাকে। কিন্তু এখনতো ক্লাসগুলো বন্ধ আছে। এরফলে তাদের সিলেবাসই শেষ হবে না। সঙ্গতকারণেই সেখানেও সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে দিতে হবে। নতুবা পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কি লিখবে-এনিয়ে এখনই আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে শিক্ষা প্রশাসনের দৃষ্টি এখন চলতি বছরে। এবছরের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে ২০২১ সালেরটা ভাবা হবে। শিক্ষা প্রশাসন মুখে ফুটে কিছু না বললেও, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যা জানা গেছে, তা হলোÑপরিস্থিতির উন্নতি হলে জুনের মধ্যে নেয়া হবে স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু পিছিয়ে যেতে পারে আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা। আর পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির দুই সমাপনী বা পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা সময়মতো নেয়া হলেও কাটছাঁট করতে হবে সিলেবাস। করোনা ভাইরাসের কারণে চলমান সাধারণ ছুটি আর না বাড়ানো হলে মধ্যজুনে স্থগিত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর চিন্তাভাবনা চলছে। ১৬ মে’র পর বোর্ডগুলো পরীক্ষার নতুন সূচি তৈরি করবে। আর ছুটি বাড়ানো হলে ঈদের ছুটির পর সময়সূচি তৈরি করা হবে। সেক্ষেত্রে জুনের শেষের দিকে শুরু হতে পারে চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, এখন পর্যন্ত সৃষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী আগামী ৩০ মে পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি থাকছে। এতে আড়াই মাস শ্রেণি কার্যক্রম থেকে শিক্ষার্থীরা দূরে আছে। কিন্তু এরপরও যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়, সেক্ষেত্রে সংকট তৈরি হতে পারে। যদিও আমরা বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইতোমধ্যে তিনটি বিকল্প নির্ধারণ করে রেখেছি। সেগুলো হচ্ছে  যদি জুনে কার্যক্রম শুরু করা যায় তাহলে ক্ষতি কীভাবে পোষানো হবে। আর যদি জুলাই বা আগস্টে শুরু করতে হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি কোন পথে পোষানো হবে, সেটা ধরে আরও দুটি বিকল্প করা হয়েছে। যদি জুনেই শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা যায় তাহলে সংকট আমরা সহজেই উৎরাতে পারব। কিন্তু জুলাই বা আগস্টে শুরু করতে হলে বা সেটি যদি সেপ্টেম্বরে গড়ায় তাহলে সংকট গভীর হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেছেন, শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে। ছুটি বেড়ে গেলে বড় সমস্যা হবে জেএসসি পরীক্ষার। এক্ষেত্রে আমরা ১৫ মার্চ পর্যন্ত যতটুকু পড়িয়েছি এবং পরীক্ষার আগ পর্যন্ত যা পড়াতে পারব তার মধ্যে নভেম্বরেই পরীক্ষা নেব। কেননা, এক বছর মেয়াদি সেশনের পরীক্ষা পেছানো যাবে না। আর এসএসসি-এইচএসসির সিলেবাস ছোট করা যায় না। গোটা বই থেকেই পরীক্ষা নেয়ার স্বার্থে প্রয়োজনে পরীক্ষা পেছাতে হবে। সেক্ষেত্রে ২০২১ সালের ফেব্রæয়ারিতে এসএসসি আর এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা হবে না। হয়তো পেছাবে।
এদিকে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে প্রায় দুই মাস ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলেছেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি উন্নতি না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। দীর্ঘ সময় এই অস্বাভাবিক বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি তারা মানসিকভাবে ভালো নেই।
সিলেটের বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারি অধ্যাপক অবিনাশ আচার্য্য বলেছেন,  দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের উপর। স্কুল চালু থাকলে পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সামাজিকতাও শিখে। কিন্তু এখন তারা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। স্কুলে পড়াশুনা না হলে শিক্ষার্থীরা ঘরে পড়তে চায় না। সবমিলিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার নিয়মিত রুটিনে বড় ধরণের ছেদ পড়েছে। এখন তাদের রুটিন বলতে আর কিছু নেই। এতে তাদের মানসিক বিকাশের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
  •