রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দেশকে সাজাতে ঢাকাকে রাঙাতে কোনো স্বপ্ন নেই



চৌধুরী জহিরুল ইসলাম ::
মানুষ ইচ্ছে করলেই স্বপ্ন দেখতে পারে। একজন মানুষ স্বপ্ন দেখে নিজেকে পাল্টায়। কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে নিজেদের পরিবেশ কিংবা সমাজটাকে পাল্টায়। অনেক মানুষ একত্রে স্বপ্ন দেখে একটি রাষ্ট্রকে পাল্টায়।
কেউ একজনও স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত করতে পারে হাজার জনের ভেতর। কালের পরম্পরায় সেই স্বপ্ন বিকশিত হবে। যুগোপযোগী হবে। কিন্তু মানুষ যদি স্বপ্নই না দেখে, তবে নিজেকে এবং সমাজকে পাল্টাবে কিভাবে? ফলে যা হবার তাই হবে! যুগের পর যুগ ধরে স্বপ্নহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং একসময় দেশটা, সমাজটা হয়ে যাবে স্বপ্নহীন মানুষের জঞ্জালে পরিপূর্ণ!
স্বপ্নহীন মানুষ মুমূর্ষু রোগীর মত। সারাজীবনের করোনা আক্রান্ত। ছোট্ট, সীমিত জীবনের মূল্যবান বসন্তগুলো পার করে জরাগ্রস্ত পান্ডুর এবং বিবর্ণ দিনের মতো।
স্বপ্নহীন জীবনে সে বারবার অবসাদে আক্রান্ত হয়। কারণ, করার মত কিছুই তার হাতে নেই! খুব তুচ্ছ অথচ প্রয়োজনীয় কাজকেও সে মনে করে অপ্রয়োজনীয়।
প্রকৃতির অপার দানের প্রতিও তার কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ থাকে না! প্রকৃতির দান, সম্ভাবনা ও আত্মপোলব্ধির জায়গাটি থাকে বদ্ধ জলাশয়ের মতো। সেখানে কোনো রৌদ্র কিরণ পৌঁছে না। সেখানে পানি থাকে, কিন্তু সে পানি হয় পানের অযোগ্য। এমনকি সেটি মশার উপদ্রব ছাড়া মৎস্যেরও চারণভূমি হয় না! বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, পাড়াগাঁয়ের পরিবেশ পরিস্থিতির কথা বাদ দিলাম। খোদ ঢাকা শহর, যেখানে সর্বাধিক স্বপ্নবাজ মানুষের বসবাস; যেখানে আছে আইন, আদালত, পার্লামেন্ট, মিডিয়া, পত্রিকা, সর্বাধিক উপাসনালয়, শত শত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, ডাকসাঁইটে হাসপাতাল ইত্যাদি। সেখানকার পরিবেশ কী?
আমরা কি ঢাকা শহরের কোনো এলাকাকে পরিকল্পিত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে পরেছি? আমি ঢাকায় গেলে অভিজাত, অনভিজাত, নতুন, পুরাতন সব জায়গাতেই থাকার সুযোগ হয়। কেবল সুউচ্চ দালান কেতাদুরস্ত বাড়িঘর এবং শপিংমল নির্মাণ ছাড়া গত প্রায় ৫০ বছরে আমরা পরিবেশের ইতরবিশেষ উন্নতি করতে পেরেছি কি?
ঢাকার বাজারগুলোর অবস্থাদেখেন! যেখানে ঢাকার অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে সপ্তাহে দু’বার হলেও যেতে হয়! কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর বাজার, গুলশান বাজার, হাতিরপুল বাজার, জিগাতলা বাজার, শাখারি বাজার, তাঁতি বাজার, ইসলামপুর, বাংলা বাজার, গুলিস্তান, মগ বাজার, মৌচাক, মালিবাগ, কোথায় আবর্জনা আর দুর্গন্ধ নেই?
আপনি সদরঘাট টার্মিনালের আশেপাশে হেঁটে বেড়িয়েছেন কখনো? দেখেছেন-কী আবর্জনা এবং ভাগার ঠেলে আপনাকে একটি ডিঙ্গি নৌকায় চেপে বসতে হয়? সেই নৌকাটি কী পরিমাণ কুৎসিত কালো পানি ঠেলে ওপারে পৌঁছে? সেই কালো পানিতে প্রতিদিন কী পরিমাণ মানবসন্তান গোসল সারে, দেখেছেন কখনো?
আপনি সন্ধ্যায় হাতিরঝিলের আলোক সজ্জা দেখে মুগ্ধ। অথচ আপনি কি খেয়াল করেছেন, হাতিরঝিলে যন্ত্রচালিত নৌকাগুলো চলার সময় দু’পাড়ে যে ঢেউ ঠেলে দেয়, সেই ঢেউয়ের সঙ্গে কতটা দুর্গন্ধ ভেসে আসে? সকালে হাঁটার সময় কি লক্ষ করেন নিয়ে হাতিরঝিলের পাড় ঘেঁসে পানিতে কী পরিমাণ ময়লা, আবর্জনা ভেসে বেড়াাচ্ছে?
ঢাকার যে কোনো মেলা প্রাঙ্গণ দেখেছেন কতটা অল্প সময়ের মধ্যে আবর্জনার প্রাঙ্গণে পরিণত হয়? আপনি বায়তুল মোকাররমের আশপাশ ঘুরে দেখুন। কী পরিমাণ আবর্জনা রাস্তায় পড়ে আছে, দেখুন।
অথচ ফুটপাতের দোকানদাররা ঠিকই কাউকে না কাউকে প্রতিদিন চাঁদা দেয়। কিছু লোক সেই চাঁদার উপর বসে বসে দিন গোজরান করে। অথচ আবর্জনা কুড়াবার জন্য একটি লোককে নিয়োগ দিতে এদের যত অসুবিধা। এমনকি সাধারণ আবর্জনা ফেলার একটি ঝুড়িও আপনি দেখবেন না রাস্তার পাশে।
গতবার ঢাকা গিয়ে খালি পানির বোতল হাতে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছি। কোথাও পানি পান শেষে খালি বোতল ফেলার কোনো বিন পেলাম না রাস্তার ধারে। অগত্যা বয়ে বয়ে বাড়ি পর্যন্ত এনেছি!
পৃথিবীর কোথাও, কোনো এলাকা এখন আর লৌহ যবনিকায় লুকানো নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণেও মানুষ এক দেশে বসে আরেকটি দেশ সম্পর্কে জানতে পারে। এমনকি আমাদের দেশের ছোট্ট ছোট্ট শহরগুলোর শত শত ভিডিও পাওয়া যায় ইউটিউবে। সেইসব ভিডিও দেখে মানুষ সহজেই বুঝতে পারে আমাদের দেশের মানুষের, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজের নেতৃত্বশীলদের মানসিক উচ্চতা কোন স্তরে!
বঙ্গবন্ধুতো বাঘের বাচ্চার মতই বলেছিলেন, “আই এম এ বাঙালি, আই এম মুসলমান, বাংলাদেশ ইজ মাই কান্ট্রি। আই লাভ মাই কান্ট্রি পিপল।” কিন্তু দেশটা যাদের হাতে সঁপে দিয়ে গেছেন-তারা কি নিজেরা স্বপ্ন দেখে? নাকি অন্যদের স্বপ্ন দেখাতে পারে?
লেখক : সাংবাদিক, নিউইয়র্ক প্রবাসী।

  •