বুধবার, ২৭ মে ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইবনে বতুতার জন্মস্থানে একদিন



অম্লান দেওয়ান::
কিশোর বয়সে যার ইতিহাস পড়েছি বইয়ের পাতায়, বড়দের মুখে শুনেছি কল্পকাহিনির মতো একদিন তার জন্মশহরেযেতে পারবো ভাবিনি কখনো। ১৯৯২ সালে ছাত্রাবস্থায় ওআইসির স্কলারশিপ নিয়ে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে পড়াশুনা করতে যাওয়ার সুযোগ হয়। রাবাতে ছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কোনো এক গ্রীষ্মের ছুটিতে হাজির হই মরক্কোর উত্তরের শহর তানজিরে…যেখানে জন্ম নিয়েছিলেন ইবনে বতুতা।
দেশ-বিদেশে ঘুরতে পছন্দ করেন এমন সবার কাছে পরিচিত একটি নাম ইবনে বতুতা। পর্যটক, চিন্তাবিদ, ধর্মতাত্তি¡ক, দার্শনিক ইবনে বতুতা ঘুরে বেড়িয়েছেন সারা বিশ্ব। আফ্রিকা থেকে ভারতবর্ষ, ভারতবর্ষ থেকে ইউরোপ। এমনকি বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি। কখনো নদীপথে, কখনো উটের কাফেলায় কখনো পায়ে হেঁটে এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। ১৩০৪ সালের ২৪ ফেব্রæয়ারি মরক্কোর তানজির শহরে তার জন্ম। পুরো নাম শেখ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ। তার পিুা ছিলেন একজন বিচারপতি। ২১ বছর বয়সে হজ পালনের জন্য মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন। শুরু হয় তার পর্যটকজীবন। বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকার নানা দেশ, মিসর, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন কোনো দেশই তার ভ্রমণের গন্তব্য থেকে বাদ পড়েনি।
আফগানিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফর শেষে মালদ্বীপ হয়ে ইবনে বতুতা বাংলাদেশে আসেন ১৩৪৬ সালের ৯ জুলাই।
বাংলাদেশে তার ভ্রমনের বর্ণনা লিখে রেখেছিলেন তিনি: “..টানা ৪৩ রাত সাগরে কাটিয়ে অবশেষে আমরা বাংলাদেশে পৌঁছলাম। সবুজে ঘেরা বিশাল এক দেশ। প্রচুর চাল পাওয়া যায়। এ দেশে অল্প দামে জিনিস পত্র পাওয়া যায়। অন্য কোনো দেশে এমনটি আর দেখিনি।”
প্রথম তিনি যে শহরে প্রবেশ করেন তার নাম সাতগাঁও বা চাটগাঁও। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তিনি পার্বত্য এলাকায় যান। দেখা করেন সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিন বা হজরত শাহজালাল (রহ.)। হিন্দু ও মুসলিম উভয় স¤প্রদায়ের উপর সুফি দরবেশদের প্রভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি নদীপথে সোনারগাঁও যাত্রা করেন।
দুই মাসের মতো সময় তিনি বাংলাদেশে কাটান। তার লেখায় বাংলার জলবায়ু, আবহাওয়া তুলে ধরেছেন। নিজে বাজারে গিয়ে জিনিসপত্রের দামের তালিকাও করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক অবস্থার কথাও তার বর্ণনা থেকে বাদ পড়েনি। লেখা ও বর্ণনা থেকে পরিষ্কার তিনি বাংলার সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এসব কারণেই মরক্কো পৌঁছার পর থেকেই ইবনে বতুতার জন্মশহর তানজির ভ্রমণের ইচ্ছা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মরোক্কান বন্ধুদের কাছে জানতে পারলাম.. অত্যন্ত সুন্দর একটি শহর তানজির। অবস্থান মরক্কোর উত্তরে। ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক মিলিত হয়েছে এ শহরেই। তাই এটিকে বলা হয় পৃথিবীর শেষ সীমানা। এখানেই রয়েছে গ্রীক পুরানের চরিত্র হারকিউলিসের গুহা। আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগর যে পয়েন্টে মিলিত হয়েছে সেখানটাতেই এ গুহা।
কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল ইবনে বতুতাকে নিয়ে। মরোক্কান বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম তানজিরের কোথায় ইবনে বতুতার কবর তা কি জানো? তার উত্তরসূরিদের কেউ কি এখনো আছে ঐ শহরে? অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, ইবনে বতুতা তাদের কাছে মোটেই পরিচিত নয়। এমনকি ইবনে বতুতার নামও তারা শোনেনি। এক দুইজন নাম শুনলেও বিস্তারিত কিছু বলতে পারলো না। আমি নাছোড়বান্দা। যে করেই হোক তানজির যাবো। খুঁজে বের করবো ইবনে বতুতার বাড়িঘর কিংবা কবর।
মরক্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম আমার ইচ্ছার কথা শুনে বললেন, তিনিও আমার সঙ্গী হতে চান। সঙ্গে নিতে চান তার স্ত্রী পুত্রদেরও। আমার জন্য ভালোই হলো। সানন্দচিত্তে সদলেবলে বাসে চেপে রওনা হলাম তানজির শহরের উদ্দেশ্যে। কয়েক ঘন্টার ভ্রমণ শেষে আমরা পৌঁছে যাই ছোট ছিমছাম শহর তানজিরে। হোটেলে ব্যাগ তল্পিতল্পা রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
আমি ফরাসি জানি। টুকটাক আরবিও বলতে পারি। বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় অনেকের কাছেই ইবনে বতুতার বাড়ির গন্তব্য জানতে চাইলাম। কেউ জানাতে পারলো না। কিন্তু হতাশ হলাম না। চেষ্টা চালিয়ে গেলাম…।
অবশেষে একজন চিনতে পারলেন। কিভাবে কোন পথে যেতে হবে নির্দেশনা দিলেন। আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এক টিলার উপর ইবনে বতুতার কবর। দু’পাশে অসংখ্য বাড়িঘর। তার মাঝখান দিয়ে টিলার দিকে উঠে গেছে সরু রাস্তা। রাস্তার শেষপ্রান্তে এসে দেখা মিললো ইবনে বতুতার কবর। ২০ ফুট বাই ২০ ফুটের ছোট একটি পাকা একতলা ঘর। তার মাঝখানে সবুজ আর লাল কাপড়ে মখমলে জরির কাপড়ে ঢাকা বতুতার কবর…।
ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে চাইলে বাধা দিলেন একজন। আরবি আর ফরাসি মিশিয়ে বললেন, নিষেধ আছে। ছবি তুলবেন না। কিন্তু এতদূর এসে ছবি তোলা ছাড়াই ফেরত যাবো তাতো হয় না। অবশেষে ম্যানেজ করা হলো ঐ কেয়ারটেকারকে। তোলা হলো ছবি। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে যেন ফিরে গেলাম ৮ শত বছর পেছনে-যখন ইবনে বতুতা পা ফেলেছিলেন আমার জন্মভূমি চট্টগ্রামে…আর বাংলাদেশে ।
লেখক : সাংবাদিক, ফরাসি দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা।