বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

শবে কদরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য



আফতাব চৌধুরী::
দেখতে দেখতে পবিত্র রমজান মাস প্রায় ফুরিয়ে গেল, লগ্নের তৃতীয় ১০ দিনে অবতরণ করল। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র রমজান মাসকে তিন ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছেন। রহমত, বরকত ও মাগফিরাত। তৃতীয় ১০ দিনে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার মুসলমানদের জাহান্নাম বা দোজখের আগুন থেকে নাজাত বা মুক্তি দেন। প্রথম ১০ দিন আমাদের উপর রহমত বর্ষিত হয়। দ্বিতীয় ১০ দিনে মাফ করে দেয়া হয়। তাই রমজান মাস হলো রহমত, মাগফিরাত ও জান্নাতের মাস। হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, রমজান মাস পেয়ে যে তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না সে বড় হতভাগ্য।রমজানুল মোবারকের রাত সমূহরে মধ্যে এমন একটি রাতকে ‘শবে কদর’ বলা হয়। যেটি বড় বরকতের রাত। ‘শব’ ফরাসি শব্দ, যার অর্থ রাত। আর কদর মানে মর্যাদা। ‘শবে কদর’ পবিত্র কুরআনে যাকে ‘লাইলাতুল কদর’ বলে উল্লেখ করেছে, এর অর্থ হলো মর্যাদাপূর্ণ রাত। ইসলাম ধর্ম-বিশ্বাসের আলোকে কালের প্রতিটি ঘন্টা, প্রতিটি মিনিট, সময়ের প্রতিটি মুহ‚র্ত, দিবানিশীর প্রতিটি লগ্নে পুণ্যময় ও মঙ্গলজনক। কোনো একটি মুহ‚র্তকে অশুভ যা অমঙ্গলজনক মনে করা ইসলাম সম্পর্কিত কাজ নয়।
মহানবী (সা.) বিভিন্ন হাদিসেও বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, কালের কোনো একটি মুহ‚র্তকেও অশুভ মনে করো না। বস্তুত সময় আল্লাহর মাহাত্মের বহিঃপ্রকাশ বরকত মাহাত্ম্য উৎকৃষ্টার দিক দিয়ে একটি মাস অন্য একটি মাসের উপর। একটি নিশি অপর একটি নিশির উপর এমনকি একটি মুহূর্ত অন্য একটি মুহ‚র্তের উপর শ্রেষ্ঠত্ব রাখে। এ ধরনের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্যের অবগতি ‘কুরআন’ ও বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে যে সকল দিন রাত বা মুহূর্তের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কথা ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তন্মধ্যে ‘শবে কদর’ অন্যতম। এ রাতটি রমজান মাসের শেষ বেজোড় ৫টি রাতের যে কোনো একটি রাত হতে পারে। লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত, যার মহত্ব মহান আল্লাহর নিকটও রয়েছে। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা কুরআনের মতো বিরাট বিরাট নিরাময় নাজিল করেছেন এ রাতে এর চেয়ে অন্য কোনো নিয়ামত মানুষ ধারণা ও কামনা করতে পারে না। পবিত্র কুরআনে উক্ত রাতকে এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে। এক হাজার মাসে তিরাশি বছর চার মাস হয়। ভাগ্যবান ওইসব লোক যাদের উক্ত রাতের ইবাদত নসিব হয়। কেননা একটিমাত্র রাত সে ইবাদতে কাটাল, সে যেন তিরাশি বছর চার মাসের চেয়ে বেশি সময় ইবাদতে কাটাল।
নবী করিম (স.) বলেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের রজনিতে ঈমান সহকারে ও সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করার জন্য খাড়া হয় তাদের বিগত জীবনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। শবে কদরের ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা একটি সূরা নাজিল করেছেন। সে রাতের ফজিলত সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো। এই রাতের যে কোনো ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত থেকে উত্তম। এ রাতে জিব্রাইল, মিকাইল, ইসরাফিল, আজরাইল বেহেশত থেকে ৪টি পতাকাসহ প্রতিজনের সঙ্গে ৭০ হাজার ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। প্রথম পতাকা হামদের পতাকা, দ্বিতীয় পতাকা মাগফিরাতের পতাকা, তৃতীয় পতাকা মর্যাদার পতাকা, চতুর্থ পতাকা রহমতের পতাকা। হামদের পতাকা আকাশ এবং জমিনের মাঝখানে মাগফিরাতের পতাকা প্রিয় রাসুল (সা.) এর রওজার উপরে মর্যাদার পতাকা রাইতুল মোকাদ্দাসের উপরে এবং রহমতের পতাকা বাইতুল্লাহ কারাগৃহের ওপরে রাখা হয়। এ রাতে তওবা কবুল হয়। এ রাতে আসমানের দরজা সমূহ উন্মুক্ত হয়। ইবাদতকারীদের ফেরেশতারা সালাম ও মুফাহা করেন। এ রাত আত্মীয়স্বজনের রূহের মাগফিরাত কামনার উদ্দেশ্যে কবর জিয়ারত ও দোয়া করলে আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। এ রাতে দুআ পড়তে হবে ‘হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাকারী আর ক্ষমাকে পছন্দ করেন। অতএব আমার প্রার্থনা আমাকে ক্ষমা করে দিন।
শবে কদরের রাত আগমনের পূর্ব থেকে লা হাওলা, ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লহ পড়ে শয়তান দূর করতে হয়, তাই এ দোয়া সূর্যাস্তের সময় ৪০ বার পড়বে। কুরআন শরিফ এ রজনিতে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই কুরআনের সঙ্গে এ রাতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই সে রাতে বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা কর্তব্য। নফল নামাজের মধ্যে বিশেষ করে সালাতুত তাসবিহ পড়তে হয়। এ রাতে রাসুল (সা.)-এর শিখানো দোয়া বেশি বেশি করে পড়তে হবে। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে হবে। প্রিয় রাসুল (সা.) শবে-কদরের কিছু নিদর্শনের কথা বলেছেন, ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। এদিন সূর্য উদয় হবে তবে লাল বরণ ম্রিয়মাণ হবে। ইবাদতকারীদের ইবাদতে একাগ্রতা সৃষ্টি হবে। কুরআন তিলাওয়াত তৃপ্তিদায়ক হবে। গাছপালা সমস্ত সৃষ্টি জীব আল্লাহ পাকের সিজদায় পড়ে যাবে। প্রত্যেক স্থানে নূরের জ্যোতি চমকিতে থাকবে। বস্তুত এ রাত শুধু উম্মতে মোহাম্মদিকে দান করা হয়েছে। পূর্ববর্তী কোনো উম্মতকে এ মর্যাদাপূর্ণ রাত দান করা হয়নি। রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় ৫টি রাতের যে কোনো একটি হলো লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। সুবহে সাদিক পর্যন্ত সারা রাত থাকে শান্তিতে ভরপুর।
হজরত রাসুলে করিম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান ও আশা নিয়ে শবে কদরে দুআ ও ইবাদত-বন্দেগি করবে, আল্লাহ তায়ালার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন। বিভিন্ন হাদিস দ্বারা জানা যায় যে, ব্যক্তি মাহে রমজানের এ মহান রজনি ‘শবে কদর’ থেকে বঞ্চিত হলো সে যেন সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো। আর চরম হতভাগ্য সে যে এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়।
মূলত শবে কদর মাহে রমজানের একটি অনির্দিষ্ট রাত। তবে হাদিস শরিফে রমজানের শেষ ১০ দিনের যে কোনো বেজোড় রাতে শবে-কদরের ইঙ্গিত রয়েছে। হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে হুজুর (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে শবে কদর তালাশ করো। অনেক মনিষী ২৭ রমজানের রাতকে শবে কদর হবার অধিক সম্ভাব্য রাত হিসেবে উল্লেখ করলেও একমাত্র সম্ভাব্য রাত বলে নির্ধারিত করেননি। আমরা যদি একমাত্র ২৭ রমজানের রাতকে ‘শবে কদর’ হিসাবে নির্দিষ্ট করে নেই, তবে এটি হতে পারে ‘শবে কদর’। এ রজনিকে অনির্দিষ্ট রাখার তাৎপর্য এটি হতে পারে যে, প্রতিটি মুসলমান সব ক’টি সম্ভাব্য রাতকে শবে কদর তালাশ করে তার পুণ্যের ভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ করে নেবে। তার জন্য শবে কদর রাতের সুবর্ণ সুযোগ হলো, রমজানের শেষ ১০দিন মসজিদে ইতেকাফ করা। মহিলাদের জন্য নিজ গৃহে ইতেকাফ করার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বস্রষ্টার অনন্ত রহমত ও বরকতপূর্ণ শবে কদর কোন রাত্রি তা দিয়ে পরিলক্ষিত হয়। পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনা এর দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, শবে কদরের আগমন রমজান মাসে হয়ে থাকে।
লেখক: কলামিস্ট।

  •