বুধবার, ২৭ মে ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

গোলাপগঞ্জে অটোরিকশায় দ্বিগুণ ভাড়া : গ্রাহকদের ‘পকেট কাটছে’ পল্লি বিদ্যুৎ



স্টাফ রিপোর্টার::
করোনায় বন্ধ রয়েছ গণপরিবহন, নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলছে অটোরিকশা নিচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। এদিকে, করোনাকালে গ্রাহকদের ‘গলা কাটছে’ পল্লি বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক বিলের ঘাটতি আবাসিক গ্রাহকের ওপর।  করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে মানুষ পার করছে দুর্বিষহ সময়। কঠিন এই সময়ে সিলেটে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাঁ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি। করোনাকালে গ্রাহকদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ বিল। অটোরিকশা নিচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। পল্লি বিদ্যুৎও করোনাকালে গ্রাহকদের ‘পকেট কাটছে’।
গত শনিবার সকালে উপজেলার গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে দাঁড়িয়ে এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। গোলাপগঞ্জ থেকে ঢাকাদক্ষিণ ১৫ টাকা ভাড়ার জায়গায় ২৫/৩০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। ভাদেশ্বর ৩৫ টাকা ভাড়া হলেও বর্তমানে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে নিচ্ছেন অটোরিকশা চালকরা। আমনিয়া ১০ টাকা করে ভাড়া নির্ধারণ করা থাকলেও সেখানে রাখা হচ্ছে ২০ টাকা,
গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে কথা হয় যাত্রী ফয়সল আহমদের সাথে। তিনি বলেন, ঢাকাদক্ষিণ থেকে গোলাপগঞ্জ একটু দরকারে এসেছি। ভাড়া দেওয়ার সময় ড্রাইভার বলেন ২৫ টাকা। এ নিয়ে ড্রাইভারের সাথে কিছুটা কথাকাটাকাটি হয়।
হেতিমগঞ্জ থেকে গোলাপগঞ্জ আসা আরেক যাত্রী আব্দুল কাদির। তিনি বলেন, অটোরিকশা চালকেরা নিয়মের চেয়ে বেশি ভাড়া রাখছেন। তাদের সাথে কথা বলে পারা যায় না। রাস্তায় গাড়ি কম, এই সুযোগ তারা কাজে লাগিয়ে আমাদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নিচ্ছেন।
অটোরিকশা চালক এমরান আহমদ বলেন, আমরা কিছুটা ভাড়া বেশি যাত্রীদের কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছি। তবে যাত্রীরা যে এত টাকা নিই অভিযোগ করলেন, সেটা মিথ্যা।
আরেক অটোরিকশা চালক জামিল আহমদ বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে আমরা গন্তব্যস্থলে এই লকডাউনে মধ্যেও পৌঁছে দিই। এতে কিছু ভাড়া হয়তো বেশি চাই।
ভাড়া বেশি চাইবেন কেন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সারাদিন রাস্তায় যাত্রী কম থাকেন। আয়ও কিছুটা কম হয়। তাই যাত্রীদের কাছ থেকে একটু বেশি ভাড়া রাখি আমরা। রাস্তায় পুলিশ মামলা দেয়। মামলার টাকা তো দিতে হবে। তাই ভাড়া বেশি নেই।
এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ অটোরিকশা, অটোটেম্পো, শ্রমিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পুতুল মিয়া জানান, যে দিন থেকে সরকারিভাবে পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, সেদিন থেকে আমরা সবাইকে বলেছি গাড়ি বন্ধ রাখার জন্য। তারপরও কিছু ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছেন। ভাড়া বেশি নেওয়ার কয়েকটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি।
তিনি বলেন, যারা ভাড়া বেশি নিচ্ছে তাদেরকে আমরা বলেছি ভাড়া নিয়ম মাফিক নেওয়ার জন্য। যাত্রীদেরকে হয়রানি না করার জন্য।
এদিকে, করোনার সময় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের বিল বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করছেন সিলেট পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এস এম হাসনাত হাসান।
পল্লি বিদ্যুতের এমন কান্ডে বিড়ম্বনায় পড়েছেন সিলেটের প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক। করোনার এই কঠিন সময়েও পল্লি বিদ্যুতের এমন অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ তারা। গোলাপগঞ্জের উত্তর রণকেলি গ্রামের সুমাত ন‚রী চৌধুরীর বাড়িতে গত এপ্রিল মাসের বিদ্যুৎ বিল পাঠানো হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৫ টাকা। ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫২৫ ইউনিট। বিদ্যুৎ বিলের ওপরে সিল মেরে লিখে দেওয়া হয়েছে ‘আপনার অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আপনার গত বছরের একই সময়/একই মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে গড় বিল প্রণয়ন করা হলো। কোনো অসঙ্গতি থাকলে পরবর্তীতে তা সংশোধন/সমন্বয় করা হবে। ’ বিলের ওপর গত বছরের একই সময়ের/মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ভিত্তিতে গড় বিলের কথা হলেও সুমাত ন‚রী চৌধুরীকে দেওয়া হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ বিল। ২০১৯ সালের এপ্রিলে তার ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ ২৯৫ ইউনিট ও বিল ছিল ১ হাজার ৭৪১ টাকা। একইভাবে বিলের ওপর গত বছরের একই সময়ের (এপ্রিল মাসের) সমপরিমাণ বিলের কথা বলা হলেও গ্রাহকদের কাছে প্রায় দ্বিগুণ বিল পাঠাচ্ছে পল¬ী বিদ্যুৎ।
এভাবে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল আদায় করছে বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি।
বাড়তি বিলের ব্যাপারে সিলেট পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক এস এম হাসনাত হাসান দেখাচ্ছেন অদ্ভুত যুক্তি। তার মতে, করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মিল-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এরপরও তাদের বিদ্যুতের চাহিদা কমেনি। তাই তাদের ধারণা, বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন আবাসিক গ্রাহকরাই। এ কারণে তাদের ওপর বাড়তি বিল চাপানো হচ্ছে।
গত বছরের একই সময়/মাসের গড় বিলের নোটিস দিয়ে বাড়তি বিল নেওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। তার ভাষ্যমতে, কারও কাছ থেকে বাড়তি বিল নেওয়া হলে পরবর্তীতে তা সমন্বয় করা হবে। কিন্তু করোনার এই কঠিন সময়ে মানুষের কাছ থেকে বাড়তি বিল নিয়ে পরবর্তীতে সমন্বয় করা কতটুকু মানবিক এমন প্রশ্নেরও জবাব মেলেনি মহাব্যবস্থাপক হাসনাত হাসানের কাছে।
সিলেট পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর বোর্ড সভাপতি আবদুল আহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মহাব্যবস্থাপকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আবাসিক গ্রাহকের বিল বাড়বে এমনটা মানতে নারাজ তিনি। আবদুল আহাদ বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ কর্মীরা মিটার রিডিংয়ের সুযোগ পাচ্ছেন না। লকডাউন থাকায় এলাকায় পল্লি বিদ্যুৎ কর্মীদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিল দেওয়ার কথা।
পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ জানান, কোনো গ্রাহক তার বিলের অসঙ্গতি নিয়ে এলে তা ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।