বুধবার, ২৭ মে ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্যারিস থেকে জুড়ী : বাঁশের চালিতে একমাস



অম্লান দেওয়ান ::
(২০০৮ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ। আমি তখন ঢাকার ফরাসি দূতাবাসে কাজ করি। স্টিফান দো রুভিল নামের ৪০ বছরের এক ফরাসি যুবক আসলেন আমার বারিধারার অফিসে। বললেন, তিনি একজন বিশ্ব পর্যটক এবং ফটোগ্রাফার। কিন্তু অন্য আর দশজনের মতো নয় তার পর্যটন। পর্যটকরা সাধারণত বিশ্বের বিখ্যাত সব এলাকা সফর করেন। কিন্তু স্টিফানের উদ্দেশ্য ভিন্ন। অসম্ভব অদ্ভুত সব এলাকায় ঘুরে বেড়ান তিনি। অসম্ভব অকল্পনীয় আর খানিকটা উদ্ভটও তার চিন্তাভাবনা।
স্টিফানের ভ্রমনের তালিকা বেশ দীর্ঘ। কখনো সুদানের মরুভূমিতে উটের পিটে কখনো আবার পায়ে হেঁটে আমাজোনের জঙ্গলে..।
বাংলাদেশেও অন্য রকম এক ভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল তার। স্টিফান জেনেছেন, সিলেটের জুড়ী এলাকায় অত্যন্ত উন্নতমানের বাঁশ উৎপন্ন হয়। সে বাঁশ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে নদীপথে। সিলেটের কুশিয়ার নদী থেকে মেঘনা নদী হয়ে ভৈরববাজার পর্যন্ত বাঁশের চালিতে ভ্রমণ করবেন তিনি। কেবল বাঁশ বিক্রি করে কিংবা বাঁশের চালি পরিবহন করেন যারা কেমন তাদের জীবন আর জীবিকা-সেটাই বিস্তারিত জানতে চান তিনি। জানাতে চান ফ্রান্সসহ বিশ্ববাসীকে।
সেটাই করেছিলেন তিনি। মাসখানেকের বেশি সময় লেগেছিল এ মিশনে। জুড়ী সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার একটি উপজেলা। এর উত্তরে বড়লেখা, পূর্বে ভারত, দক্ষিণে কুলাউড়া এবং পশ্চিমে ফেঞ্চুগঞ্জ।
পৃথিবীর সবচাইতে আধুনিক নগর প্যারিসে আরাম-আয়েশে বড় হওয়া স্টিফান বাঁশের চালিতে জীবনযাপন করেছেন তিন সপ্তাহের মতো। ওখান থেকে ভৈরববাজারে এসে তার মিশন শেষ হয়।
ফিরে গিয়ে প্যারিস থেকে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত নদীপথের ভ্রমণবিষয়ক সাময়িকী “নাভিগাশিও দুশ” এ লিখেছিলেন অসাধারণ এক ভ্রমণকাহিনি। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এ কাহিনি অজানা।
প্রথমবারের মতো তার ভ্রমণ বৃত্তান্ত আংশিক সম্পাদনা করে মূল ফরাসি থেকে সরাসরি তরজমা করলেন অম্লান দেওয়ান। )
‘‘… সবগুলো বাঁশ একসাথে গুছিয়ে নিতে তিন সপ্তাহ সময় লেগেছিল। ভৈরববাজার পর্যন্ত যেতে লাগবে আরও তিন সপ্তাহ। ওখানেই বাঁশের চালি থেকে বাঁশগুলো আলাদা করা হবে। আর চলে যাবে ব্যবহারকারীদের হাতে। এ বাঁশ দিয়ে কেউ বানাবেন থাকার ঘর, কেউ বানাবেন ঘরের দেয়াল, ছাদ, মাচা কিংবা এ বাঁশই পরিণত হবে লেখার কাগজে। আবার এ বাঁশ পাশ্চাত্যে রপ্তানি হয়ে যেতে পারে কোনো হস্ত ও কারুশিল্পের আদলে।
এ বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়ে গহিন অরণ্যে কখনো প্রচন্ড গরমে আবার কখনো প্রচন্ড ঠান্ডায় কঠোর পরিশ্রম করেন শ্রমিকরা। মোকাবিলা করতে হয় সাপ, জোঁক, মশা কিংবা পোকামাকড়ের আক্রমণ। এছাড়া মুখোমুখি হতে হয় ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলাদের কিংবা বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের। কখনো দা দিয়ে বাঁশ কাটার তাল কেটে যায় গুলির শব্দে।
কিন্তু শ্রমিকদের কাছে এসব কোনো বিষয় নয়। তাদের আসল ভয় কাজ হারানোর ভয়। বেকার হয়ে পড়ার ভয়।
কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীতে কাদায় একাকার হয়ে বাঁশের বান্ডিল তৈরিতে ব্যস্ত জনাদশেক শ্রমিক। বাঁশের তৈরি রশিতে ১০০ টা বাঁশ দিয়ে তৈরি এক একটা বান্ডিল। ৫ টা বান্ডিলে তৈরি হয় একটা চাটা। দেখে মনে হয় যেন এক একটা ডুবন্ত ভেলা। অনেক চাটা মিলে তৈরি হয় “ চালি”। বিশাল এক একটা চালি লম্বায় ৮০ মিটার আর চওড়ায় ২০ মিটার।
আমজাদ খুব খুশি। তিনিই এ বাঁশের চালির মালিক। প্রতিটি বাঁশ কিনেছেন ৬ টাকায়। গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এ দামেই আশিকের কাছ থেকে বাঁশ কিনে আসছেন আমজাদ। আশিক জুড়ীর ক্ষমতাশালী মহালদার। সরকারের কাছ থেকে বাশের বনভূমি লিজ নিয়েছেন। বাঁশ কেনাবেচার সব কাজকর্ম তিনি নিজে দেখাশোনা করেন। তবে তার সহকারী তজাম্মেলের উপর তার অগাধ আস্থা।
নদীর পানি কমে নিচে নেমে যাওয়ার আগে এ মওসুমের শেষ চালি এটি। আর কিছুদিন পর হাকালুকি হাওড় পাড়ি দেওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে। হাকালুকি বাংলাদেশের সবচাইতে বড় হাওড়। তারপরও রমজানের শেষ সময়। সামনে ঈদে মিলাদুন্নবী। উৎসব পালন করার পর চালি নিয়ে রওনা হতে আমজাদের কাছে আব্দার করলো তার শ্রমিকেরা। তাদের দাবি পূরণ হলো। কঠিন যাত্রা শুরুর আগে উৎসব পালনের সিদ্ধান্ত হলো।
যাত্রা হলো শুরু: দুই ঘন্টা কঠোর পরিশ্রমের পর তৈরি হলো অসাধারণ “ চালি”।
যাত্রা শুরু হলো। দলনেতা তোজাম্মেলের নিদের্শমতো এগিয়ে চলল “চালি”। সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখিরা যেন এ জলযান দেখছিল অবাঁশ বিস্ময়ে। নদীর দুধারে মানুষের জীবন থেমে নেই। এরই মধ্যে এগিয়ে চললাম আমরা। কিন্তু আমাদের গন্তব্য আর কত দূর?
এরই মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। বাঁশের চালির একপাশে বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট একটি কক্ষ। সবাই ওখানে জমায়েত হলো। শুরু হলো রাতের খাবারের আয়োজন। স্টোভ জ্বালানো হলো। আজকের খাদ্য তালিকায় আছে: ভাত আর মাছ ভাজা। পুরো ভ্রমণ জুড়ে এটাই হবে আমাদের খাবারের মেন্যু।

পরদিন। সূর্য পূব আকাশে উঁকি দিচ্ছে। আমাদের ভেলা কুয়াশায় পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। আমাদের অনেক সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। যে কোনো মুহ‚র্তে বাঁশের ধারালো অংশে কেটে যেতে পারে হাত-পা। অনেক ঝুঁকি নিয়ে সর্তক হয়ে চলাফেরা করতে গিয়ে শরীরের পেশিগুলো টানটান হয়ে পড়ল। কোথাও কোথাও ব্যথা অনুভব করলাম।
আমাদের যাত্রার তৃতীয় দিন। আমাদের আমাদের আশেপাশে ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকা দেখলাম। নিশ্চিত হলাম, আমরা নদীতেই আছি, সাগরে নয়। কারণ সাগরে এত ছোট নৌকা থাকার কথা নয়।
এরই মধ্যে হঠাৎ একজন উঠে আসল আমাদের চালিতে। একটা ‘দা’ হাতে নিয়ে রান্না করার ছোট কক্ষটিতে একবার উঁকি দিল। ফিরে গেল তার নিজের নৌকায় যেটি চালির একপ্রান্তে অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
‘‘তোমার ক্যামেরা লুকাও”-ফিসফিস করে বলল তোজাম্মেল। সে বুঝে গেছে-আমরা ডাকাতের পাল­ায় পড়েছি। ডাকাতদের চলাফেরা ভাবভঙ্গির সঙ্গে সে পরিচিত। দশ মিনিট পর ডাকাতদের ছোট নৌকাটির চাইতে আরও বড় একটি নৌকা আমাদের ‘চালি’র দিকে অগ্রসর হলো। দাড়ানো অবস্থায় তিনজন ডাকাতকে দেখতে পেলাম। কিন্তু নৌকার মাচার ভেতর আরও কয়জন আছে তা বোঝা গেল না।
‘‘দেখ..ঐ দেখ..” ডাকাতদের দিকে ইঙ্গিত করে আমাকে বলল তোজাম্মেল। কিন্তু আমাদের চালির সবাই তাদের স্বাভাবিক কাজ করে যেতে লাগল। ভাবটা এমন যেন কিছুই ঘটেনি। ওরা আমাদের দিকে এগুতে থাকল। চারপাশে শুনশান নীরবতা। আমাদের চোখেমুখে শূন্যতা। ফারুকের চেহারা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। অল্প কিছু সময় পরে ডাকাতরা ফিরে গেল তাদের নৌকায়। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাচলাম।
পঞ্চম দিনের শেষে আমরা কুশিয়ার নদীর তীরে ফেঞ্চুগঞ্জ ঘাটে এসে থামলাম। এখানে এসে শেষ হয়েছে বিশাল হাওর। লম্বা ভ্রমণে ক্লান্ত তোজাম্মেল এবার আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে। তার বদলে “চালি” তে উঠবে তার ছোট ছেলে দোদুল। দোদুল দুই বছর ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করে। বিক্রেতা আর ক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করাই তার কাজ। দেখেই মনে হলো দোদুল অনেক বুদ্ধিমান। আর বাকি পথ পাড়ি দিতে দুলাল আমাদের সহায়ক হবে।
পুলিশ আমাদের চালির কাগজপত্র পরীক্ষানিরীক্ষা করল। তাদের “খুশি” করার পর আমাদের চালির যাত্রা আবারো শুরু হলো। গন্তব্য হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মারকুলি বাঁশ বাজার। একজন ক্রেতা আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করছে। এ বাজারে পাঁচ হাজার (৫,০০০) বাঁশ বিক্রি হল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জমজমাট বাজার থেকে দামাদামির জটিল প্রক্রিয়া শেষে রাতের খাবার হিসেবে কেনা হল মাছ। সবাই মিলে চা-ও খেলাম বাজারের টি স্টলে।
আমাদের চালি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। ঘন্টায় মাত্র কয়েকশ মিটারের গতি।
প্রতিটি দিনই যেন নতুন এক একটি দিন। একটি দিনের সাথে অন্যদিনের কোনো মিল নেই।
নৌকার জালে আমাদের “চালি” আটকে যাওয়ার পর কি কি ঘটেছিল তা এক লম্বা ইতিহাস।
দশম দিনে আমরা এমন এক এলাকায় প্রবেশ করলাম যেটি ডাকাতদের অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত। ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচতে সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা এক গ্রামে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এক গ্রাম্য মাতব্বরের বাড়িতে কিছু টাকার বিনিময়ে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হলো। দোদুলের মুখে সারাক্ষণই একটি শব্দ: “টেনশন..টেনশন”। ইংরেজি এ একটি শব্দই জানে সে।
যতই দিন যায়..সমস্যা বাড়তে থাকে। সবল পেশির ক্ষমতা কমতে থাকে..বাড়তে থাকে পোশাকের ক্ষমতা। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের চালিতে হানা দেয় পুলিশ। তার চাঁদা চায়। দোদুল জানে কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু প্রায়ই তর্ক হয়। চিৎকার চেঁচামেচিও কম হয় না। একপর্যায়ে গিয়ে রফা হয়। আবারো একই ঘটনা। আবারো খুঁজতে হয় সমাধানের পথ..। কিন্তু ডাকাত আর পুলিশ কখনো মুখোমুখি হয় না। কারণ পরিষ্কার: তাদের বোঝাপড়া বেশ ভালো।
অবশেষে ভৈরববাজারের বিশাল সেতু দৃষ্টিগোচর হয়। দীর্ঘ যাত্রা বোধ হয় আপাতত শেষ হতে চলল। বাঁশের বিশাল চালির গোপন স্থানে লুকানো প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে তার কর্মচারী শ্রমিকদের মজুরি দিলেন দোদুল। প্রতিদিনের জন্য ১০০ টাকা করে। ইতোমধ্যে আমজাদ এসে গেছে। পরবর্তী দায়িত্ব তার। প্রতি পিস বাঁশ ১৫ টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়ে গেছে। দীর্ঘ যাত্রা শেষে যে যার মতো বিদায় নিলো। মিলিয়ে গেল তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে। স্বপ্নের এক জগতে কিছুদিন বসবাসের পর তারা যেন ফিরে গেলেন তাদের বাস্তব জগতে।”
লেখক : সাংবাদিক, ফরাসি দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা।