শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনার চেয়ে ক্ষুধার ভয় যাদের বেশি, কেমন আছে সেই ছিন্নমূল মানুষেরা



সুবর্ণা হামিদ::
করোনা মহামারিতে থমকে গেছে মানুষের জীবনের গতি। সারাদেশের মতো থমকে আছে আমাদের পুণ্যভূমিও। করোনায় আক্রান্ত বিশ্বের এ কঠিন সময়ে গৃহবন্দি হয়ে আছে আপামর জনসাধারণ। উষ্ণতার ছোঁয়ায় মানুষ যখন ঘুমে বিভোর, তখন এ শহরে লাখও ছিন্নমূল মানুষ অপেক্ষায় থাকতো কখন শেষ হবে এই রাত। দেখা যাবে সকালের সূর্য। বর্তমানে এই কঠিন পরিস্থিতিতে কোথায় আছে, কেমন আছে সেই ছিন্নমূল মানুষেরা? এই ছিন্নমূল মানুষের খবর কি নিচ্ছি আমরা। কারণ জনশূণ্য নগরে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে ছুটি ঘোষণার পর সব চেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে নগরীর ছিন্নমূল মানুষেরা। ফুটপাতে থাকা এই সব মানুষের আয়-রোজগারের সব পথ এখন বন্ধ। এমনকি ভিক্ষা পাওয়ারও সুযোগ নেই। নগরীর সবকটি খাবারের দোকানও বন্ধ রয়েছে, চাইলেও তারা একমুঠো খাবার জোগাড় করতে পারছে না।
নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে খাদ্যের আশায় বসে থাকা ওই সব ছিন্নমূল মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের সংকটের কথা। কিছু মানুষের অবস্থা এমন যে, করোনার চেয়ে ক্ষুধার ভয় এদের বেশি। এ মহাযুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে ওইসব মানুষ। দুই সন্তানের জননী আছমা বেগম নগরীর চৌহাট্রা পয়েন্টের পাশে ফুটপাতেই শুয়ে আছেন তার সন্তানদের আঁকড়ে ধরে। তার কাছে বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন কীসের ভাইরাস, এগুলো বুঝি না, শুধু বুঝি বাচ্চা গুলানরে খাবার দিতে হইবো, আজ কয় দিন থাইকা পেট ভরে খাইতে পাইনা আমরা, আমাগোরে খাবার দেন।
এই কথা বলেই তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে থাকেন।
আপনাদের জন্য কি কেউ খারার দেয়নি? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেনÑহ মাঝে মাঝে কোনো কোনো মানুষ আইসা দিয়া যায়, তবে এই খাবারে কি চলে? তাদের পাশে বসে আছে দুটি কুকুর, তিনি কুকুরদের দেখিয়ে বলেনÑএই কুকুর দের মতো আমাগো জীবন, এখন রাস্তায় তারাও খেতে পায় না,আর আমরাও খেতে পাই না।
এ ব্যাপারে আরেক জন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমার বাড়ি ময়মনসিংহে, আমি এখানে আম্বরখানা একটি দোকানে কাজ করতাম, এখন আর কাজ নাই, তাই এই ফুটপাতে রাত কাটাই, আমাদেরকে বেশিরভাগ সময় না খেয়ে ঘুমাতে হয়। আবার কোনো কোনো সময় রাতে দুইবারও খাবার পাই।
সরকার তাদের স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এবং জনপ্রতিনিধিগণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক খাদ্যদ্রব্য ও আর্থিক সাহায্য ছিন্নমূল জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাছাড়া সমাজহিতৈষী বিত্তবানরা কাজ করে যাচ্ছেন ছিন্নমূল ও অসহায় এইসব জনগোষ্ঠীর জন্য। এ ব্যাপারে সমাজহিতৈষীদের সাথে কথা বললে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ যুগ্ম সাধারন সম্পাদক এমদাদ রহমান বলেন, এই কঠিন পরিস্থিতি সরকারের সাহায্যের উপর এককভাবে নির্ভরশীল না থেকে নিজেরা যার যার সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ও অন্যকে এ কাজে উৎসাহিত করা, নিজ উদ্যোগে খোঁজ নিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অসহায় ছিন্নমূল মানুষদের পাশে থাকাটা আমাদের অণ্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। আর তা যতটুকু সম্ভব আমরা পালন করার চেষ্টা করছি। আমি প্রথমে নিজে থেকে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে ছিলাম, পরে আমাকে আরো উৎসাহী করে তুলেন আমার প্রাণ প্রিয় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিরা, যাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। যদিও তারা তাদের নাম প্রচার করতে আগ্রহি নন তবুও যাদের নাম না বললেই নয়, তাঁর হলেনÑনুরুল ইসলাম নাহিদ (এমপি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী), নাসির উদ্দিন খান (সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ), শাহিদুর রহমান চৌধুরী জাবেদ (সাবেক গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক সিলেট জেলা ছাত্রলীগ)। আমরা সবাই মিলে যদি সত্যিকার অর্থেই চাই, তাহলে এই জনগোষ্ঠীকে আজকের এই বিপদ থেকে বাঁচানো সম্ভব।
এ ব্যাপারে কথা হয় আরেক সমাজসেবী ময়না মোবাইল আই হসপিটাল এর ব্যবস্থাপক সৈয়দ সারোয়ার রেজার সাথে। যিনি রমজান মাস থেকে টানা ১৯ দিন ধরে রান্না করা খাবার দিয়ে আসছেন এসব ছিন্নমুল মানুষদের। বিশেষ করে যারা রাস্তার ধারে বসবাস করে গরিব, অসহায় কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মহামারিতে সারাবিশ্বের মতো যখন বাংলাদেশ লক ডাউন থাকার কারণে খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় রাস্তার পাশে থাকা এই মানুষগুলো খাবার সংকটে পরার কারণে এই উদ্যোগ নেন তিনি। প্রথমে ছেলেদের ঈদের কাপড়ের টাকায় খাবার বিতরণ শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করলে প্রবাসে থাকা আত্বীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবসহ অনেকেই এখন তাকে সহযোগিতা করছেন। আর রান্না করতে সহযোগিতা করছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। যতদিন লক ডাউন আছে তত দিনই এই খাবার বিতরণ চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।
ভালোবাসার জয় হোক, জয় হোক মানবতার, জয় হোক আমাদের দেশপ্রেমের। স্বপ্নসারথী হয়ে পাশে দাঁড়াই দুঃখী মানুষের এই প্রত্যাশাই।