শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হারকিউলিসের গুহায় একদিন



অম্লান দেওয়ান::
উত্তর আফ্রিকার একটি দেশ মরক্কো। দেশটির বুক চিড়ে বয়ে চলেছে ভূমধ্যসাগর আর আটলান্টিক। প্রকৃতির সৌন্দর্য যেন দেশটিকে করে তুলেছে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি স্থান। সবুজ বিস্তীর্ণ বনভূমি, সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, বালুকাময় সাহারা মরুভূমি আর সুউচ্চ পর্বতমালা ছাড়াও মধ্যযুগের নানা স্থাপত্য দেশটিকে করেছে সমৃদ্ধ। মরক্কোর উত্তরের এক সুন্দর শহর তানজির। এ শহরেই আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগর মিলেছে। আর এ মিলনস্থলেই জিব্রাল্টার প্রণালির দক্ষিণ তীরে গড়ে উঠেছে তানজির। ভৌগলিক কারনে এ প্রণালি আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের সহজ দ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখনো এ পথ দিয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য আফ্রিকান, এশিয়ানরা স্পেন হয়ে ইউরোপে ঢুকে। অনেকে মারাও যায়। আর সে শহরেই অবস্থিত গ্রীক পুরানের বিখ্যাত চরিত্র হারকিউলিসের গুহা। সে গুহা দেখতে ১৯৯৪ সালের কোনো একদিন পৌঁছে যাই তানজিরের এ বিখ্যাত পর্যটন স্পটে। সূর্য তখন সমুদ্রসঙ্গমে। হোটেল থেকে ৩০ মিনিটের হাটা পথ। পথের দুধারে পাইন গাছের দীর্ঘ সারি। পরিচ্ছন্ন রাজপথ। কোলাহল নেই। একটা শান্ত, সিগ্ধ পরিবেশ চারপাশে।
অবশেষে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। দেখা মিললো হারকিউলিসের গুহা। এ গুহাকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম প্রতœতাত্তি¡ক নির্দশন। মরক্কোর বাদশাহ’র অবকাশকালীন প্রাসাদের কাছাকাছি এর অবস্থান। গুহাটির দুইটি মুখ রয়েছে। একটি স্থলভাগের সঙ্গে সংযুক্ত আর অন্যটি আটলান্টিকের জলরাশির সঙ্গে। এ অংশটি দেখলে মনে হয় এ যেন পাথবের বুক চিড়ে তৈরি আফ্রিকার মানচিত্র।
জানা যায়, গুহাটির মূল অংশ প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠলেও বেরবেরিয়াানরা (পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা) একসময় এখান থেকে পাথর কেটে শস্যদানা পিষার যন্ত্র বানাতো। আর এ কারনে ধীরে ধীরে গুহাটি রহস্যময় এক রুপ নিয়েছে।
গুহার প্রবেশমুখে টিকেট কাউন্টার। যুক্তরাস্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি কিংবা জাপান, ভারত কিংবা আফ্রিকার নানা দেশের অসংখ্য পর্যটকের দেখা মিললো সেখানে। ১০ দিরহাম দিয়ে টিকেট কিনে লাইনে দাডিয়ে প্রবেশ করছেন রহস্যময় এ গুহায়।
আটলান্টিকের সৈকত থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শামুক, ঝিনুক দিয়ে তৈরি নানা পসড়া সাজিয়ে বসেছেন মরক্কান বিক্রেতারা। ওখানে ছবি তুললাম। কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না..জানালেন ব্যবস্থাপকরা।
গাইড নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। অন্ধকার গুহায় গাইডের টর্চের আলোয় পাথরগুলোর মধ্যে চোখে পড়লো ছোট ছোট কক্ষ। মরক্কান গাইড আমাকে ফরাসিতে রহস্যময় ভঙ্গিতে হারকিউলিসের সঙ্গে এ গুহার
সর্ম্পক ব্যাখ্যা করলেন। গ্রীক পুরানের সেই ইতিহাস গড়গড় করে বলে গেলেন তিনি…
‘‘…হারকিউলিসের প্রথম অভিযান শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। এ এলাকা তখন পরিচিত ছিল ” নেমিয়া” হিসেবে। প্রথম অভিযানে হারকিউলিসকে বলা হয় নেমিয়ার এলাকা থেকে সিংহ হত্যা করে নিয়ে আসতে। নেমিয়া এলাকার ত্রাস ছিল সিংহটি। অভিযানে রওনা হলেন তিনি। নেমিয়ার পৌছে তিনি খুঁজে পেলেন সিংহটির গুহা। এই গুহাটির ছিল দুইটি মুখ। হারকিউলিস গুহাটির দুইটি মুখ বন্ধ করে দিলেন। তারপর প্রবেশ করলেন গুহায়। সিংহকে দেখতে পেয়ে তির ছুড়লেন। কিন্তু সেই তীরে কোনো কাজ হলো না। এবার পাথরের তৈরি গদা দিয়ে পেটাতে লাগলেন সিংহটিকে। একপর্যায়ে পেছন থেকে ঝাপটে ধরলেন সিংহের ঘাড়। শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন সিংহটিকে।
কিন্তু কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। সিংহটির চামড়া ছিল খুবই শক্ত। কোনো অস্ত্রই তা ভেদ করতে পারতো না। আর দাঁত ও নখ এতোটাই ধারালো ছিল যে তা লোহাও কেটে ফেলতে পারতো…”
গুহার মধ্যে মাটি থেকে চার পাঁচ ফুট উচুতে ১০ থেকে ১২ ফুট লম্বা খাটের আকৃতির পাথর দেখিয়ে গাইড বললেন, সিংহটিকে হত্যার পর এখানেই বিশ্রাম নিয়েছিলেন হারকিউলিস।
অন্ধকার গুহায় টর্চের আলো ফেলে এগিয়ে গেলেন গাইড। আমিও তার পিছু পিছু। পাথরের তৈরি আরেকটি কক্ষ দেখিয়ে বললেন, এটি হলো হারকিউলিসের “কিচেন”। ছুচালো লম্বা এক পাথর দেখিয়ে বললেন, এটি দিয়েই মাছ কাটতেন..সমুদ্র থেকে শিকার করা বিশাল বিশাল সব মাছ।
গাইডের গল্প বলার মোহনীয় ভঙ্গি আমাকে যেন ফিরিয়ে নিয়ে গেলো অন্য এক জগতে।
“ গ্রীক পুরান অনুযায়ী হারকিউলিস ছিলেন গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। প্রেম, সৌন্দর্য, সাহস, উদারতা আর বীরত্বের প্রতীক। জন্ম গ্রিসের থিবিস এলাকায়। দেবরাজ জিউসের পুত্র তিনি। জিউসের মনুষ্যরূপী স্ত্রী আক্লমিনার গর্ভে হারকিউলিসের জন্ম। তার জন্মের খবর যখন স্বর্গে পৌঁছালো তার বিমাাতা হেরা দেবী হিংসায় জ্বলতে লাগলেন। বললেন, যে করেই হোক তাকে হত্যা করতে হবে। শিশু হারকিউলিসকে হত্যার জন্য শৈশবেই দুটি সাপ পাঠান হেরা। সাপ এসে শিশু হারকিউলিসকে ছোবল দেবেÑএমন মুহ‚র্তে জেগে ওঠেন তিনি। হত্যা করলেন ভয়ংকর সাপগুলোকে। এভাবেই গ্রীসের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে শিশু হারকিউলিসের বীরত্বের কাহিনি।
পরে ১৮ বছরের হারকিউলিস বাঘও শিকার করেন। ভয়ংকর দানব অ্যান্টিউস কিংবা নদী দেবতা অ্যাকিলাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়াসহ আরও নানা কীর্তি রয়েছে তার।
নিজেকে সত্যিকারের বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ফিলোকটেসের কাছে গেলেন। কঠিন সাধনা আর প্রশিক্ষণের পর তিনি রওনা হলেন থেবসের দিকে। পথে তার সঙ্গে দেখা হয় এক দৈত্যের। অর্ধেক মানব আর অর্ধেক ঘোড়ার অবয়বে তৈরি এ দৈত্যকে পরাস্ত করেন। দৈত্যটি একটি সুন্দরী মেয়েকে আক্রমন করেছে। তাকে উদ্ধার করেন। মেয়েটির নাম ছিল মেগারা। মেগারার সৌন্দর্যে ম্গ্ধু হয়ে যান হারকিউলিস। তাকে শেষে বিয়েও করেছিলেন তিনি…।
বাবা জিউসকে তিনি বললেন, বাবা আমিতো তোমার কথামতো নিজের বীরত্ব প্রমাণ করেছি। এখন কেন আমি অমরত্ব পাচ্ছি না? কেন স্বর্গে
আমার স্থান হচ্ছে না?
বাবা জিউস বললেন, যতোক্ষন তোমার মনে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা থাকবে তুমি অমরত্ব পাবে না। স্বর্গেও মিলবে না তোমার জায়গা।
এবার হারকিউলিস খুজতে লাগলো তার দুর্বলতা। তিনি দেখলেন তার একমাত্র দুর্বলতা মেগার। মেগার ভালোবাসার কারণেই স্বর্গ হারালেন তিনি। ভালোবাসার কাঙাল হয়ে কাটিয়ে গেলেন মর্ত্যলোকে…।
লেখক : সাংবাদিক, ফরাসি দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা।