শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

নিমগ্ন এক সবুজের ডাক



মতি গাজ্জালী::

ঘর। আর বারান্দা। কখনো জানালায় উঁকি দেয় উদাস আকাশ। অনিমিখ তাকাই উড়ন্ত কোনো পাখির ডানার বাতাস ভাঙা দেখে। চড়ুই পাখিদের চঞ্চলতা। বিদ্যুতের খুঁটিতে নিশ্চিন্তে বসা। ক্ষণিক পরে উড়াল। বসে আবার কোনো বাড়ির কার্নিশে। নির্বিঘœ চলাচল। একটু পরেই জুটি মিলে। ঠোঁটে ঠোঁট। কত কথা। কত আদর সোহাগ। ভ্রƒক্ষেপ নেই কারোর। শাসন বারণহীন একল দুর্দান্ত জীবন। খাদ্য মজুদের ভাবনা নেই। আগুন পানির চিন্তা নেই। বাজারঘাট করার প্রয়োজন নেই। নেই কোনো বাধানিষেধ।
পৃথিবীর মানুষ যখন বন্দি। ভাইরাস আতঙ্কে যখন মানুষ গৃহবন্দি, তখন তারা স্বাধীন উন্মুক্ত প্রকৃতির মত। হাসপাতাল নেই। ডাক্তার নেই। মাস্ক হ্যান্ডগøাভসের প্রয়োজন নেই। এদের মৃত্যুর সংবাদ নেই। পাশের বিল্ডিংয়ের খুপরিতে প্রজননে ব্যস্ত। চই চই ডাক বন্ধ নেই।

চোখ চায় একচিলতে সবুজ আজ। এই শহরে কোথাও সবুজ নেই। যেখানে আবাস গড়েছি, একটা গাছের দেখা নেই সেখানে। অক্সিজেন কোথায়? আকাশ উপুড় হয়ে আছে আমাকে সঙ্গ দিতে। দুপুরের গনগনে তাপে আকাশের বুকে চোখ ফেলতেই দৃষ্টি ফিরে আসে অসহ্য এক টাটানিতে। কেমন এক অসহ্য সময়। কেমন এক একাকী দুঃসময়। ঘর আর বারান্দা জীবন। ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা। গিন্নিকে সহায়তা করা। তিনবেলা খাওয়া। বিকেলে নাশতা। একথা সেকথা। জীবনের পাওয়া না পাওয়া হিসেব, এসব চলছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ। লেখাপড়া, বিয়েশাদি। এমনই কথাসব।

মানুষ সামগ্রিক নয়। নিজ নিজ স্বার্থ আর সুখ শান্তি নিয়েই ভাবে। আমিও তেমন ব্যতিক্রম নই, এই অসময়গুলোয় বুঝলাম। এই দুঃসময়ে না অর্থে, না শ্রম ঘামে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারছি। শুধু নিজে বাঁচো। নিজে খাও দাও ফুর্তি করো। পাশের বাড়ি ভালো আছে। গাড়ি আছে। অঢেল সম্পদ আছে। আমার নেই। হিংসে। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ। মন্দ প্রতিযোগিতা। অপরে অসৎ। আমি কেন তার মতো অসৎ অন্যায় অন্যায্য অর্থবান, সম্পৎশালী হতে পারলাম না, তা নিয়ে অনুশোচনা। গবেষণা। কেন এই ব্যর্থতা, তা নিয়েও সংসারে কথা হয়। অভিযোগ অনুযোগ ওঠে। ভালো আছি। ভালোবাসায় আছি। এসব নিয়ে কথা হয় না। সৎ থাকার। ন্যায়বান হওয়ার কথা হয় না। দলবাজ হলে কতটা ভাল থাকা যায়, সুখে থাকা যায়, প্রতিবেশীর দিকে আঙুল তুলে উদাহরণ দেওয়া হয়।

মিথ্যে বলা এখন পাপ নয়। এমনই সময়। সরকারের ভালোমন্দের সাথে থাকাও এখন একটা যোগ্যতা। টেন্ডারবাজি, দালালি, মাস্তানি, ফুটপাতের দখলদারি, নদী খাল দখলদারি ইত্যাতি অন্যায্য অন্যায় কাজগুলোকে আমরা সহজ করে মেনে নিয়েছি। বিচার না পাওয়া মেনে নিয়েছি। সব অনিয়ম মেনে নিয়েছি। এই যে নপুংসক ভাবনা, এই যে খোঁজা ভাবনা, সেখানে আইনের শাসন, সুশাসন, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা কেমন করে আসে। আমরা সব অনিয়ম মেনে নিয়েছি। একটা অসভ্য সমাজ আর রাষ্ট্র গড়তে চলেছি।

সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে। তিন ফসলি জমিগুলোতে কলকারখানা গড়ে ওঠছে। নদী দখলে যাচ্ছে কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের। নদী মরবে, ফসলি জমি নিঃশেষ হবে। তাহলে সবুজ বাঁচে কেমনে। নদী যদি না বাঁচে, মাঠ আর জীবন বাঁচে কেমনে? মানুষের পাপ আজ বিস্তারিত। পাপ আর অন্যায়ের ফল তো মানুষকেই পেতে হয়। মাটি আর কতটা আগ্রাসন সইবে? প্রকৃতি কতটা ভার বইবে পাপবিদ্ধ মানুষের? আকাশকে দুষে লাভ নেই। প্রকৃতির এই রোষানল মানুষকেই পোহাতে হবে। গজব মনুষ্য সৃষ্ট। মানুষ তাই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবেই হবে। প্রকৃতির শোধ ভয়ানক। এমন করে ভাবি না বলেই আমরা আজ বিবেকহীন। অমানুষ আর রক্তপাতের শিকার। শান্তি নেই। স্বস্তি নেই। দেশ লুট করে বিদেশে আবাস গড়ি। দেশপ্রেমের কথা বলি। স্বাধীনতার কথা বলি। গণতন্ত্র আর সুশাসনের কথা বলি। উন্নয়নের ¯েøাগান দিই। সত্য বলি না। প্রতিবাদ প্রতিরোধ ভুলে গেছি। রাজপথে ¯েøাগান মিছিল নেই। এমন একটা নির্বাক সমাজে আজ আমাদের বাস।
লেখক : কবি, সাংবাদিক, অধ্যাপক।