শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চর্বিত নির্যাস – ৫



মীর লিয়াকত::
পৃথিবী থেকে স্বাভাবিক সবকিছুই বিদায় নিয়েছে এবং নিচ্ছে। বদলে যাচ্ছে চলন-বলন আয়োজন প্রয়োজন সব কিছু। নতুন ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দিয়েছে করোনা। কী করতে হবে কীভাবে করতে হবে, কেন করতে হবে, কেন করতে হবে নাÑএসব কিছুর পাঠই এখন করোনার কাছ থেকে শিখতে হচ্ছে। তার পাঠদান থেকে সরে এসে কিছুই যে করা যাবে না তা পৃথিবীর তাবৎ মানুষ এতদিনের মরণযজ্ঞে হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে। এতকাল পৃথিবী যেভাবে চলে এসেছে এখন যে আর সেভাবে চলা যাবে না, আর চললেও বিকল্প নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে এটাও মানুষ ভালোভাবে বুঝে গেছে। প্লেগ, বার্ডফ্লুসহ অনেক ভাইরাসের সাথে শত শত বছর ধরে মানুষের পরিচয় হয়েছে। তখনো মানুষ একটার পর একটা আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রতিরোধ প্রতিকার খুঁজে এসেছে, সফলও হয়েছে। করোনার বিষয়ে সময় লাগলেও সফল হবে হয়তো। কিন্তু একটা বিষয় এখনো অস্পষ্ট যে, বর্তমান কম্পিউটর প্রযুক্তির মতো অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সে সময়ে ছিল না। যা বর্তমান পৃথিবীতে আছে। সেই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েও বাঘ বাঘা দেশ করোনাকে থামাতে পারছে না। উল্টো বরং তার কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করছে। বরেণ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর হলেও করোনা একেবারে নির্মূল হবে না। যদি নির্মূল না হয় আর থেকেই যায় তবু পৃথিবীর এতকালের স্বাভাবিক অবস্থান আর ফিরে আসবে না। কারন ভাইরাস তো একটি নয়। একটি থেকে আরোও জন্ম নিতে পারে। আর তা যদি হয় তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিশ^জুড়ে থেকেই যাবে।

যেমন পৃথিবীর চিরন্তন অভ্যাস হ্যান্ডশেক করা। গøাভস ছাড়া এই কাজটি আর তাহলে হচ্ছে না। কি বলছি, গøাভস থাকলেও মনে হয় এই সৌহার্দ্যপূর্ণ কাজটি আর কেউ করবেন বলে মনে হয় না। যেমন মাস্ক ছাড়া সর্বদা সব সময়  আর থাকা যাবে না, বাইরে তো নয়ই এর মধ্যে মাস্ক ছাড়া আবার জরিমানাও। অনেক দিন, বছর, যুগ পর শ্রেষ্ঠ সামাজিক জীব মানুষ কারো সাথে দেখা হলে সহাস্যে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরা হ্যান্ডশেক করা তো দূরের কথা, থাকতে হবে মেপে মেপে তিনফুট দূরে!  কি অবস্থা, কল্পনা করা যায়? কিন্তু এখন এটাই বাস্তব। শুধু তাই নয়, ইচ্ছা মতো বাইরে পোশাক পরাও যাবে না। তার মানে পোষাকে আশাকেও আসছে স্থায়ী পরিবর্তন। নন্দিত চোখ ধাঁধানো ড্রেস করে মুখ ঢেকে রাখা একটি অভিশাপ দেখা গেলেও কিছুই করার নেই। এটা করে যেতেই হবে। সুরক্ষার জন্য চশমা মুখাবরণ ইত্যাদি তো আছেই। মাথার বাহারি চুলটাও কাউকে দেখানো যাবে না। বাইরে গেলে পড়ে থাকতে হবে নিদেনপক্ষে পলিথিন জাতীয় কিছু। এয়ারকন্ডিশন সেলুনে গিয়ে পা ছড়িয়ে দিয়ে চোখ বুজে বলতে পারবেন না ‘মাথাটা একটু বানিয়ে দেতো বাপ’! পাছে ভাইরাস এসে ঢুকে যায়! সেই সাথে পিপিই’র কথা তো রয়েই গেল। সুরক্ষার জন্য এটিও বাদ যাবে না। ঈদের দিনের ঐতিহ্যবাহী কোলাকুলি আর হচ্ছে না। সৌদিয়ান ঐতিহ্যের গালে চুমো খাওয়াটাও রাখতে হবে বাদ। তিনফুট দূর থেকে এটা করাও যাবে না। আন্তরিকতার সাথে কোনো সভাসমিতিতে পাশ ঘেঁষা থাকবে বন্ধ। হাতে হাত রেখে অন্তরঙ্গ হয়ে পার্ক সাফারিতে ঘুরাঘুরিও সম্ভবত বন্ধই হচ্ছে ভাইরাস আক্রমণ থেকে রেহাই পেতে। এক কথায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বিশেষত কার্যকর কোনো অতি নির্ভরযোগ্য ভ্যাক্সিন না আসা পর্যন্ত বেশিরভাগ সময়ই দূরত্ব অবলম্বন করে থাকতেই হচ্ছে। প্রয়োজনের বাইরে আত্মকেন্দ্রিকভাবে কাটাতে হবে সময়। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা আড্ডা ইয়ার্কির জমকালো অবস্থান বাদ রাখতেই হবে। স্বাভাবিক জীবনে এ এক অস্বস্তিকর জীবন। অনেকে অবশ্য এখনো বলেন এসব ভাইরাস বেশি দীর্ঘায়িত হবে না। কিছুদিনের মধ্যেই চলে যাবে আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসবে। বিশ^বার্তা কিন্তু তা বলছে না। আমাদের দেশে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে সংক্রমণ। বাড়ছে মৃত্যুর হার। করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেছেন ড. আনিসুজ্জামান, মোস্তফা কামাল  সৈয়দসহ বিশিষ্টজনেরা। রয়েছেন সাংবাদিক আইনজীবী চিকিৎসক ব্যবসায়ী এবং নানা পেশার মানুষ। আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা মোহাম্মদ নাসিমও আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। আগামীতে আরো কি হতে পারে তা জানে ভবিতব্যই। আর আক্রান্ত হবার প্রেক্ষাপট তো তৈরি হচ্ছে প্রতিদিনই। তাহলে কীভাবে ফিরে আসবে সহসাই আমাদের স্বাভাবিক জীবন?
এখানে বলা দরকার এক সময় সংক্রামক ব্যাধি ডায়রিয়া কলেরাও এভাবে ঘটিয়েছে জীবনহানি। কিন্তু  একসময় দেখা গেছে এক চিমটি গুড় লবণ আর পানি দিয়ে মূহ‚র্তে স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব হয়েছে। বেরিয়েছে প্যাকেট স্যালাইন। বলতে গেলে কলেরার মতো মারাত্মক জীবাণু এসে গেছে হাতের মুঠোয়। কিন্তু তার জন্যও সময় দিতে হয়েছে। ম্যালেরিয়াও দেখা দিয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মারাত্মক মহামারিরূপে। এই ম্যালেরিয়ার জীবাণু আবিষ্কারের জন্য স্যার রোনাল্ড রস (১৮৫৭-১৯৩২) ইংল্যান্ড থেকে ভারতের সিকান্দারাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে এসে তার গবেষণা করেছিলেন। অবশ্য তার জন্মও ছিল ব্রিটিশ ভারতে। পরে এই স্কটিশ জেনারেলের পূত্র ইংল্যান্ডে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। অ্যানোফিলিশ মশার ওপরে গবেষণার জন্য তাকে ভারতে আসতে বলা হয়েছিল। রোনাল্ড রস ছিলেন বিশে^র দ্বিতীয় নোবেল বিজয়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানী। তাঁর আবিষ্কারটি ছিল সেই সময়ে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে তার মধ্যে রয়েছে জার্মানি,  যুক্তরাষ্ট্র,  যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, রাশিয়া, চীন।
কোভিড-১৯ কিন্তু উক্ত সবকটি দেশেই বিশেষভাবে আক্রমণ চালিয়েছে, লক্ষ লক্ষ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। ১৯০১ সাল থেকে বিশে^ চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। উল্লিখিত দেশগুলোর সবকটি দেশই সেই থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। কিন্তু কোভিড-১৯ এর উপর এখনো কোনো আবিষ্কার হাতে এসে পৌঁছায়নি। যদিও সারা বিশে^ই এই ভ্যাক্সিন আবিষ্কার নিয়ে কাজ অব্যাহত আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ইতোমধ্যে তারাও বসে নেই। মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ হয়েছে। কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করে যেতেই হবে। আগেই বলেছি, এখন জীবন পদ্ধতি বদলে চলতেই হবে। ঝট করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব নয়। কতদিন কতো মাস বা কতো বছর তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু পরিবর্তিত রূপকে মেনে নিতেই হবে। পৃথিবীর যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসাত্মক আক্রমণ অস্ত্রশস্ত্র ও পারমাণবিক প্রতিযোগিতা ধ্বংসলীলা সম্প্রসারণবাদী চিন্তাচেতনা থেকে আপাতত হলেও সরে থাকতে হবে। এর বদলে অর্থনৈতিক দিক নিয়ে ভাবতে হবে । অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়া বেকারত্ব কর্মহীনতা দুর্ভিক্ষ ক্ষুধা ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হবে বিশে^র মানবকুলকে। আপাতত হলেও শক্তি প্রতিযোগিতা ভুলে থাকতে হবে।
সদিচ্ছা থাকলে এখান থেকে মানুষ নতুনভাবে শান্তির নতুন পৃথিবী গড়ার কাজে কিন্তু আত্মনিয়োগ করতে পারে। কারন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা আপনা আপনিই হবে। এখানে কারো ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। হতে পারে করোনার শেষ। কিন্তু এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে না এগোলে নতুন ভাই্রাসের আগমনও কিন্তু অমূলক নয়। এ সবই ভবিতব্য। তবে বিশ^বাসী একটা মোক্ষম সিগন্যাল পেয়ে গেছে। এখন এটাকে কাজে লাগানো না লাগানো মানুষের ইচ্ছা। এসব কিছু বুঝে শুনেই চলতে হবে আগামীর পৃথিবী।
আমাদের দেশে ২০২০ সাল শুরু হয়েছিল এক আনন্দঘন চিন্তাচেতনা নিয়ে চলতি বছরটি মুজিববর্ষ। ১৭ মার্চ পর্যন্ত ক্ষণ গণনার মাধ্যমে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বছরটি শুরু হয়। করোনার প্রকোপে সব লন্ডভন্ড হয়ে না গেলে এই মুহ‚র্তে সমগ্র জাতির থাকার কথা নানা আয়োজন নিয়ে। কমতি ছিল না স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ-উচ্ছ¡াসের। বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠান সরকারি-বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী দফতর ও সংগঠন স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটিসহ সারা দেশজুড়ে সকলেরই এই বছরটি কাটত বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিতর্পণ ও আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে। আয়োজন ছিল বিশাল বিশাল আয়োজনের। কোনো কিছুরই কমতি ছিল না।
বছরের শুরুটাই বাংলাদেশের প্রাণের মেলা একুশে বইমেলা দিয়ে শুরু হয়। এইবার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিব বর্ষ উপলক্ষ্যে বইমেলার আমেজটাও ছিল ভিন্ন। ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য ২০১৯ ও ২০২০ বইমেলা ছিল বিশেষভাবে আমার মনে রাখার মতো। তার কারণ গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে আমার সর্বোচ্চ ১৪ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। বছরের হিসাবে এটিই সর্বাধিক সংখ্যা। এবার ২০২০ সালেও ৯ টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের অন্যতম ছিল ‘গল্পসমগ্র’ এবং ২০২০ সালে ‘উপন্যাস সমগ্র’। ২০১৯ সালে বইমেলা মঞ্চে গল্পসমগ্রের মোড়ক উন্মোচনে ছিলেন দেশের খ্যাতনামা প্রকাশক অন্যপ্রকাশ-এর মাযহারুল ইসলাম বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. জালাল আহমদ, সাংবাদিক কাজী তোফায়েল সিলেট সমিতি উত্তরার সভাপতি ক্যাপ্টেন মিজানুর রহমান প্রকাশক আলিফ আহমাদ প্রমুখ। আর ২০২০ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার ৩৯ তম বর্ণাঢ্য প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ‘উপন্যাস সমগ্র’-এর মোড়ক উন্মোচনে ছিলেন দ্য নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক এ এম মোফাজ্জল এবং সংগঠনের চার দশকের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ। মুজিববর্ষে নিজের এই বইগুলো আমার শতাধিক প্রকাশনার সাথে যুক্ত হওয়ায় ব্যক্তিগত আনন্দও ছিল অপরিসীম। প্রকাশিত নতুন বইয়ের গন্ধ আনন্দ সব সময়ই আমার কাছে মহানন্দ। আর কবে এই আনন্দ জীবনে আসবে জানি না।  বয়সের শেষভাগে না আসার সম্ভাবনাই বেশি।
বইমেলার শেষে একদিন ছিলাম ইন্টারন্যাশনাল কালচারেল ফোরাম আইসিএফের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে আইসিএফ চেয়ারম্যাান দেশের খ্যাতিমান সংগীত ব্যক্তিত্ব ড. কাজী ফারুক বাবুল জানালেন এবারের মুজিববর্ষে তিনি আয়োজন করেছিলেন দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম। তার ভিউ অনুযায়ী ঘোড়ার গাড়িতে পরিবেশিত হবে তারই লেখা সুর ও সংগীত আয়োজনের একটি গান। ঘোড়ার খুরের আওয়াজের সাথে মিউজিক করা গানটি শুনে বুঝলাম আসলেই অসাধারন। যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন তিনি এই প্রোগ্রাম নিয়ে। এরপর ছিল কাজী ফারুক বাবুলের লেখা ও সুর  করা শত কন্ঠে শত গান। একই দিনে এই পর্বটিও তিনি তৈরি করেন। শতজন শিল্পীর মধ্যে কারা কারা থাকবেন তার তালিকাও তখন তিনি প্রস্তুত করছিলেন। কিন্তু এ সমস্তই ছিল কাজী ফারুক বাবুল ও তা আইসিএফের আয়োজন। কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এত বিশাল আয়োজন সরকারি কোনো সংগঠন কিংবা কোনো বিভাগের ছত্রছায়ায় হচ্ছে। এমন অনেকেই আছেন ছোটখাটো আয়োজন করে সরকারি বড় ফান্ড হাতিয়ে নেয়।  হাজার হাজার গানের জন্মদাতা কাজী ফারুক বাবুল এই ব্যাপারে সত্যিই ব্যতিক্রম। তাঁর কথা হলো, ‘নিজের লেখা নিজের সুর নিজেরই সংগীতায়োজন নিজেদেরই পরিবেশনা নিজের মতোই করতে চাই।
     আমাদের কাজ দেখে সরকারি কোনো সংস্থা এগিয়ে এলে  আমরা সাধুবাদ জানাব কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষে নিজের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে সরকারি ফান্ডের লোভে ধর্না দেব কেন?’
ভালোই লাগল। এমনিই হওয়া চাই। সবাই যদি সরকারি সংস্থাসমুহের ফান্ডের দিকে চেয়ে অনুষ্ঠান করেন তাহলে তো সেই সব অনুষ্ঠানের আন্তরিকতা থাকে না। হবে একান্তই দায়সারা বা ফরমায়েশি। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন কথা হচ্ছিল ফোনে কাজী ফারুক বাবুলের সাথে। এ জন্যেই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। তিনি সেই আয়োজনের জন্য আক্ষেপ করছিলেন। বললেন, ‘যদি বেঁচে থাকি আর করোনা আমাদের মুক্তি দেয় তাহলে ইনশাআল্লাহ তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন।’
এতো গেল আমার ব্যক্তিগত কথা। ২০২০ আমাদের মুজিববর্ষ যেমন বাস্তবায়িত হতে পারেনি তেমনি সারা বিশে^ও  অতি গুরুত্বপূর্ণ নানা ধরনের কর্মসূচি জাতীয় ও আন্তর্যাতিক পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়নি। আসলে এইবার বাংলাদেশে মুজিববর্ষের আনন্দ উচ্ছ¡াস নিয়েই যাবার কথা বছরটি। অথচ প্রাণঘাতী করোনা সারা পৃথিবীকেই লন্ডভন্ড করে দিল। যতো যাচ্ছে দিন ততই প্রচন্ড হুমকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জীবন। মুজিব বর্ষের প্রাণবন্ত সকল আয়োজন তাই করোনার মারমুখি অবস্থানে ভেস্তে গেল। শুধু যে আইসিএফ তা নয়, দেশ জুড়ে হাজার হাজার সংগঠন প্রতিষ্ঠান এমন আয়োজন থেকে আশাহত হয়েছে। কিছুই করার নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানাদিই শুধু নয় প্রাণঘাতী ভাইরাসের আক্রমণের ভয়াবহতায় স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানও সীমিত করেছেন। বিশে^ এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আগামীর দিন কীভাবে সূচিত হবে তা শুধু সময়ই বলে দিতে পারে। গোটা বিশে^র সাথে এবার মধ্যপ্রাচ্যও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। তেলের দাম পড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই কমে যেতে হচ্ছে ডলারকে। তেল বিক্রি দূরের কথা এখন ক্রেতাকে উল্টো দিতে হচ্ছে নগদনারায়ণ। তেলই যদি বিক্রি না হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্য কি খেজুর ব্যবসা করে চলতে পারবে? পর্যটন খাত শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছুলে কী নিয়ে চলবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো? এই কঠিন অবস্থায় পর্যটকরা কী বেরুবেন ঘর থেকে? বেরুলেও বা কতজন? পোষাতে পারবে না বলে বাংলাদেশসহ সব দেশের জনশক্তি আমদানি বাদ দিতে হবে। বলা হচ্ছে আসল কথা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপরে। কিন্তু পরিস্থিতি যে কী হতে পারে মোটামুটি বিশে^ সবাই তা কম বেশি টের পেয়ে যাচ্ছে। এটা বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। ভারতের চৌকস চিকিৎসক যিনি ইতোমধ্যে এশিয়া তথা বিশে^র অনেক দেশে সুপরিচিতি অর্জন করেছেন সেই দেবী শেঠিই বলেছেন, ন্যূনতম এক বছর মোটামুটি ঘরমুখো হয়েই বিশ^বাসীকে থাকতেই হবে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া বন্ধ রাখতেই হবে। এছাড়া এই ভাইরাস থেকে বাঁচা যাবে না। ডা. দেবী শেঠি আরো বলেছেন, তিনি মনে করেন এই ভাইরাসের স্থায়িত্ব বিবেচনায় সব ধরনের ভ্রমণ বাদ দিতে হবে। কোনো সভা-সমাবেশে যাওয়া যাবে না। এক কথায় দূরত্ব অবলম্বনকে স্থায়ী রূপ দিয়ে অন্তত এক বছর চলতে হবে। ডা. দেবী শেঠি এক বছর বলেছেন, সেই সূত্র ধরেই অন্তত দুই বছরের প্রস্তুতি থাকতে হবে। সাধারণ ভাবে এটা অসম্ভব মনে করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে কিছুই এসে যায় না। বাঁচতে হলে এটা করেই যেতে হবে। ডা. দেবী শেঠির দেশ ইন্ডিয়া তাদের জনসংখ্যা অনুপাতে ভালো অবস্থানেই আছে। সেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কড়াকড়ি আরোপ করায় মানুষ তা মানতে বাধ্য হচ্ছে।
কিন্তু বাংলাদেশে ঢিলে তেতালা অবস্থান থাকার ফলে ঈদের আগে লাখো মানুষের ঢল যেভাবে গ্রামের দিকে ছুটেছে তাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন কোনো বাধা দেয়নি। ফলে নির্বিঘেœ করোনা গ্রামে গ্রামে ডোর টু ডোর নির্বিঘেœ পৌঁছে গেছে। এই ভয়াবহ রূপ যে কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।  অফিস-আদালতও খুলে দেয়া হয়েছে জীবিকার প্রয়োজনে। ষাট শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে গণপরিবহণ কিভাবে দূরত্ব অবলম্বন করে তা দেখার বিষয়। এই ভয়াবহ সময়ে গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি সাধারন মানুষকে ঠেলে দেবে ভয়াবহ অর্থকষ্টে।  দুতিন মাস বসে বসে খেয়ে এখন এই খরচ কীভাবে তারা মোকাবেলা করবে তাই নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের নাভিশ^াস উঠবে। কারণ দূরত্ব অবলম্বন কিংবা করোনা চলে গেলেও ভাড়া আর কমবে না এটা সবাই জানেন।
এদিকে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েই চলছে।  এখান থেকে পরিত্রাণ নেই বলেই মনে হয়। অফিস-আদালত খোলার পর নতুন সংক্রমণের সবে শুরু। ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে’ বললেই যে স্বাস্থ্যবিধি সবাই তা মেনে চলবেন এই কর্মটি বাংলাদেশে অচলই বলা যায়। বাংলাদেশে কতোটুকু সম্ভব তা মোটামুটি জানেন সবাই। এটা করতে হলে প্রত্যেকের পেছনে পেছনে একজন করে পুলিশ র‌্যাব দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। ঠাসাঠাসি করে গণপরিবহনে ওঠানামার মধ্যে আমাদের দেশের একটা রেওয়াজই অন্যরকম। এখানে দূরত্ব অবলম্বন কী করে সম্ভব? সিট খালি না থাকলে যে আরেকজনকে ঠেলাঠেলি করে কিংবা পারলে ঘাড়ে চড়ে বসার অভ্যাস সেখানে দূরত্ব অবলম্বন? তারপর আছে কন্ডাক্টারদের কাজকারবার। সুযোগ পেলেই একজন যাত্রীকে পারলে চালকের কোলে বসিয়ে হলেও ভাড়াটা ঠিকই আদায় করবে। এসব নিয়ে শুরু হবে নতুন বাকবিতন্ডা, মারামারি, ধাক্কাধাক্কি! এসব সামাল দেবেন কে? মনিটরিং করবেন কে? ডবল ভাড়া আদায়ের প্রসঙ্গে না-ই গেলাম। সরকারের লকডাউন মেনে চলার আহŸান কতটুকু মানা হয়েছে তা তো আমরা ইতোমধ্যে বার বার দেখেছি।
এক কথায় অস্বাভাবিক জীবনের পথে ছুটতেই হচ্ছে আমাদের। তবু সীমিত সক্ষমতা নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে। জীবনের এক মহাপরিবর্তিত রূপ! করোনার হাত ধরেই এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন। এখন শুধু অনাগত ভবিতব্যকে সামনে রেখে দেখে যাওয়া ছাড়া আর আমাদের  কিছুই করার নেই। যদিও আমরা চাই করোনার এই ভয়াবহতা কাটিয়ে আবার যেন আমরা সুন্দর স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারি, এই প্রত্যাশা রেখে আজ এখানেই শেষ করছি।
-মীর লিয়াকত, বিশিষ্ট লেখক।