বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা মহামারিতে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বড় চ্যলেঞ্জ



বৈশ্বিক করোনা মহামারির এবারের বাজেট ঢেলে সাজানো হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সার্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতার প্রশ্নটি বিরাট চ্যলেঞ্জের সম্মুখীন। সরকারকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
জাতীয় সংসদে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। এতে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ। এখানে মোট রাজস্ব আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, বিদেশি উৎস থেকে সহায়তা ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এবারের বাজেট কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়ক হবে, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সুদৃড় করণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এটাই মানুষের প্রত্যাশা। সেই লক্ষ্যে সরকার জাতীয় বাজেটের ১৫%-২০% শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বৈশ্বিক অঙ্গীকার করলেও ২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়েছে ১১.৬৯%।
করোনা মহামারির কারণে মার্চ ২০২০ থেকে মানুষ যে ধরনের স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও শিক্ষা ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে, তা থেকে উত্তোরণের জন্য এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, জরুরি অবস্থায় শিক্ষা, কর্মসৃজন, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে তা সবারই প্রত্যাশা। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রভাব থাকায় দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ১,০৩,০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থাকলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ উলে­খযোগ্য হারে বাড়েনি।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা খাতে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৯,৯৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে তা ২২,৮৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং পারিবারিক উন্নয়ন বিভাগসহ এ খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ ২৯,২৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত বছরের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে ১৩.৬৬%। সেই তুলনায় শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি উলে­খযোগ্য নয়। টাকার অংকে এই বৃদ্ধি ৮.৬৪% হলেও জাতীয় বাজেটের অনুপাতে বৃদ্ধি মাত্র ০.০১%।
সরকার বরাবরের মতো এবারও অন্যান্য বিভাগ বা মন্ত্রণালয় যুক্ত করে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বেশি দেখানোর প্রয়াস হিসেবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭,৯৪৬ কোটি টাকা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ১,৪১৫ কোটি টাকাসহ শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ৮৫,৭৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্রটি বেরিয়ে এসেছে। একদিকে যেমন মহামারি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির স্বাস্থ্যখাত, সেই সঙ্গে এর নানা দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
জুন মাসে বাংলাদেশে জাতীয় বাজেটের আলোচনায় তাই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্য খাত।
অনেকেই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অনেকে আবার বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্যখাতের নাজুক অবস্থার পরিবর্তন হবে না, এজন্য দরকার বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কার্যকর ব্যবহার। সেই সঙ্গে বহু বছর ধরেই স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থহীন ব্যয়ের অভিযোগও উঠছে। সরকারি স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশার কারণে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে বেসরকারি বিশাল একটি চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা। যেখানে চিকিৎসা সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্যা প্যাসিফিকের (এসকাপ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপির বিচারে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৫২টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়া হয় বাংলাদেশে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মুখ থেকেই বক্তব্য এসেছে যে, স্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি কর্মকর্তাদের অর্থ ব্যবহার করার সক্ষমতা নিয়ে। গত কয়েক অর্থবছরে দেখা গেছে বরাদ্দকৃত অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়। তার কারণ কি?
বাংলাদেশে যে রোগগুলো বেশি হয় সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সময় মতো বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বাজেট দেয়া হয় জুন মাসে। সেটা ছাড় করতে দুই-তিন মাস চলে যায়। যখন টাকাটা পাওয়া যায়, তখন সময়মতো টাকা খরচ করার সময় থাকে না। খুব তাড়াহুড়ো হয়ে যায়। যার কারণে কাজ যে মানের হওয়া দরকার, তেমন কাজ করা হয়ে উঠেনা।
প্রয়োজন কোথায়, কোন ক্ষেত্রে কতটুকু দরকার সেটা যাচাই করে বরাদ্দ হয় না। এটা একটা সমস্যা। বাজেট যখন করা হয়, পূর্ববর্তী বছরের যে টাকাটা থাকে, সেখান থেকে কিছু পার্সেন্ট বাড়িয়ে দেয়া হয়।
সরাসরি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়োগ না করে আমলাদের দ্বারা স্বাস্থ্য খাত পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দীর্ঘ মেয়াদি সংস্কারে নজর থাকছে না। যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করে, তাদের স্বাস্থ্য খাতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু দুর্নীতির কেলেঙ্কারির বিষয় সামনে এসেছে। গত বছরের শুরুতে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতে ১১ টি উৎস থেকে দুর্নীতি হয়, যার মধ্যে রয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, ঔষধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পণ্য কেনাকাটায়।
কিন্তু স্বাস্থ্যখাতে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসাসেবা, রোগ প্রতিরোধ, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল বাড়ানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এই সকল দিক ঢেলে সাজানোর জন্য ব্যাপক মাত্রার এবং টেকসই সংস্কার বিষয়ে কোনো পথ-নির্দেশনা নেই। তাই জনবান্ধব ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।