শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসা নিয়ে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ : বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দায় নেবে কে



সালাম মশরুর ::
একদিকে করোনা অপরদিকে অন্যান্য ব্যাধি। দুটি ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসার অভাব। নির্দিষ্ট গতিপথে করোনার চিকিৎসা চললেও অন্যান্য ব্যাধিতে আক্রান্তরা চিকিৎসার ছিটেফোটাও পাচ্ছেন না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে চরম হতাশা বিরাজ করছে। চিকিৎসা না পেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্সেই রোগীর প্রাণ যাচ্ছে। সিলেটে সাম্প্রতিককালে বিনা চিকিৎসায় রোগীর প্রাণহানির ঘটনায় জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে, পাশপাশি মানুষের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় যে কারো অসুখ হতে পারে। মানুষ কোথায় যাবে। তবে কি এভাবেই বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে। এ বিষয়টি ভাবাচ্ছে মানুষকে।
মানুষের মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় সিলেটে প্রতিবাদী ‘কফিন মিছিল’ হয়েছে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা অবহেলায় সিলেট বিভাগ ইলেকট্রনিক্স টেকনিশিয়ান কল্যাণ সমিতির যুগ্ম আহবায়ক ও আর.এল ইলেকট্রিকের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন খোকাসহ আরো সাধারণ রোগীর মৃত্যুতে সিলেট জেলা ও মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদ প্রতিবাদ সভা করে ৭ দিনের মধ্যে সিলেটের সকল হাসপাতালে করোনা রোগীসহ সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা দেয়ার হুশিয়ারি উচ্চারণ করে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।
শেষ ধাপে এসে ঠেকেছে। এমন মহামারির কঠিন সময়ে মানুষের পাশে মানুষকেই দাঁড়াবার কথা। এমন নজির পৃথিবীর সকল দেশে রয়েছে। আমাদের দেশেও আছে। বেঁচে থাকার জন্যই চিকিৎসার প্রয়োজন। চিকিৎসক ছাড়া সেটা আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এই পেশার দায়িত্বে নিয়োজিতরাই বুঝবেন কীভাবে রোগীকে সেবা দেবেন। নিজের সুরক্ষা ও রোগীকে সেবা দেয়ার প্রযোজনীয় ক্ষেত্র তাদেরকেই তৈরি করতে হবে। বর্তমানের এই দুঃসময়ে সেবা দেয়া থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রেখে এ কেমন আত্মরক্ষা। হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে অ্যাম্বুলেন্সে অথবা বাসায় ফিরে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন রোগীরা।
ডাক্তারদের চেম্বারে তালা ঝুলছে। দেশের বতমান সংকট মোকাবিলায় দেশব্যাপী লকডাউনের সময় সরকারের সাথে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এগিয়ে এসেছে। মানুষ মানুষের জন্য এই সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে। সরকার কর্মহীন, দরিদ্র মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। সেসাথে নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়ী সংগঠন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এগিয়ে এসেছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা নিয়ে আতঙ্কের কারণে মৌসুমি জ্বর-সর্দিকাশি নিয়ে আক্রান্তরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া অন্যান্য রোগীও যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতির কারণে গত আড়াই মাসে অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এটা অব্যাহত থাকলে আরো প্রাণহানি হবে। দেশের হাসপাতালগুলোতে কোনো রোগী জ্বর-কাশি নিয়ে গেলে রোগীর কথা শুনতেও কোনো লোক এগিয়ে আসেননি। পূর্ব থেকে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, শ্বাসকষ্ট, কিডনি সমস্যার রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গিয়েও স্থান পাননি। অলিখিতভাবে হাসপাতালগুলো রোগীদের এড়িয়ে চলে। রোগী গেলে কোনো ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে দু-চারটি ট্যাবলেট লিখে দিয়ে পরবর্তীতে যোগাযোগ করার কথা বলে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। ডাক্তার কখন আসবেন, কোথায় আছেন, এই বিষয়েও সন্তুষজনক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সেক্টর হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সাধারণ সময়ে আমাদের দেশে ডাক্তার ও চিকিৎসা নিয়ে অবহেলা, অব্যবস্থা, খামখেয়ালি, ব্যবসায়িক মনোভাবের অভিযোগ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে অবহেলা, ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ, সময়মতো চিকিৎসা না দেয়ায় রোগীর মৃত্যু। ভুল চিকিৎসায় রোগীর মত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে হামলা, রোগীর স্বজনদের সাথে নার্স ও চিকিৎসকের হাঙ্গামা, হামলাসহ নানান অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে সারা বছর পত্রপত্রিকায় এই চিত্র পাওয়া যায়। অন্যান্য দেশে ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুর মতো। এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের দেশে ডাক্তার আর রোগীর ব্যবধান হচ্ছে আকাশ-পাতাল। অনেক সময় রোগীরা চেম্বারে গিয়ে কোনো ডাক্তারের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারলে, আর ডাক্তারও রোগীকে অভয় দিলে সেই রোগী যেন চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে না আসতেই ভালো হয়ে গেছেন, এমন ভাব দেখা যায়। রোগীর প্রশংসায় ভাসতে থাকবেন ডাক্তার। কোথাও সুযোগ পেলেই ঐ রোগী সবার আগে বলবেন ঐ ডাক্তারের নাম। ডাক্তার ভিজিট নিচ্ছেন ঠিকই শুধু একটু ভালো ব্যবহার, রোগীরকে রোগ নিরাময়ে কতখানি সাহায্য করে সেটা সবাই জানেন। আমাদের দেশে এই ব্যবহারটার খুবই অভাব। যে কারনে নিজের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা রেখে এই দেশের মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী দেশ ভারতে যাচ্ছেন। সেখানে রোগীরা ডাক্তারের কাছ থেকে সেবা ও ব্যবহার দুটোই পাচ্ছেন। আজকের এই দুঃসময়ে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মানবিক দিক বিবেচনা করে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ডাক্তার হিসাবে তার ঝুকি রয়েছে। আর সেই ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে কিভাবে মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় সেটা তাদেরকেই খোঁজে নিতে হবে।
সাধারণ মানুষ ডাক্তারদের সম্মানের চোখেই দেখে। নিজে খেতে না পারলেও দুর্বল এই স্থানে কখনো ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে তার ফি নিয়ে দামাদামি করে না। সিলেটে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুবরণকারী হলেন ডাক্তার মঈন। ডাক্তার মঈনের মৃত্যুর পর সাধারণ মানুষ বুকের ভালোবাসার সাগরে ভাসিয়েছে তাকে। উজাড় করে দিয়েছে শ্রদ্ধা। ডা. মঈন করোনা রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, এমনটি জানা যায়নি। সেময় সিলেট করোনার বিস্তার ঘটেনি। কিন্তু মইন ডাক্তার হিসাবে সারা জীবন মানুষের সেবা করেছেন। মানুষও তাকে মূল্যায়ন করেছে। সরকার তার পরিবারকে ৫০লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। মানুষ কখনো অকৃতজ্ঞ হয় না।
বাইরের দুনিয়ায় করোনা আক্রান্ত স্থানে ডাক্তাররা সেবা দিয়ে যাচ্ছে সেটারও উদাহরণ রয়েছে। মহামারির প্রথম ধাপে ইতালি সরকারের ঘোষণার সাথে সাথে ৮হাজার চিকিৎসক করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদানে এগিয়ে এসেছে। তারা তো জানে করোনা আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যু হতে পারে, তবুও মানবতার ডাকে তারা ঘরে বসে থাকতে পারেনি। প্রতিটি দেশে এই সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসকরা কোথাও ঘরে বসে নেই। ব্রিটেন-আমেরিকায় সেদেশের চিকিৎসকদের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের বাঙালি চিকিৎসক ও নার্সরা নিজেদের উজাড় করে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রিটেনে নিয়মিত চিকিৎসকদের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় মানব সেবায় এগিয়ে এসেছেন দেশটির অবসরে চলে যাওয়া চিকিৎসকরা। সেইসাথে বিমান বালা, ফায়ার সার্ভিস সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত যারা প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদেরকেও চিকিৎসা সেবায় মাঠে নামানো হয়েছে। এছাড়া দেশের সকল মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিবিএস শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত ছাত্রদের সরকার থেকে চিকিৎসক স্বীকৃতি দিয়ে চিকিৎসা প্রদানের জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে। ডাক্তারদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষা তাদেরকেই নির্ধারণ করতে হবে। ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা না দিলে রোগীর পরিত্রাণের অন্য ব্যবস্থা নেই। আর এই ক্ষেত্রে মানবিক বিষয়টি অগ্রগণ্য।
প্রতিবছরের এই সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপে জ্বর আর ঠান্ডার সংক্রমণ দেখা দেয় বেশি। এ বছর মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়ায় সাধারণ সর্দি-কাশি বা ফ্লুতেও উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে। যে কারণে এই সাধারণ সমস্যাগুলোও হয়ে উঠেছে ভয়ের কারণ। চিকিৎকদের মতে করোনার সংক্রমণের সঙ্গে সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার যেমন মিল আছে তেমনি আবার সুস্পষ্ট অমিলও আছে। করোনা ও সাধারণ ফ্লু দুটোই শ্বাসতন্ত্রের রোগ। দুটোর সংক্রমণ ছড়ায়ও একইভাবে ড্রপলেট (মুখ বা নাকনিঃ সৃত তরল কণা), বিভিন্ন বস্তু আর সংস্পর্শের মাধ্যমে। তাই দুটোকেই প্রতিরোধ করার উপায়ও এক। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা, হাত দিয়ে নাক-মুখ-চোখ স্পর্শ না করা; বারবার হাত ধোয়া এবং সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার মাধ্যমেই কেবল রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
সাধারণ মৃদু সর্দি-কাশি-জ্বর থেকে শুরু করে তীব্র সংক্রমণ, নিউমোনিয়া বা শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ হয়ে থাকে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর সঙ্গে মিল থাকায় সাধারণ সর্দি-কাশি হলেও সবাই ভয় পাচ্ছেন, করোনা হলো কি না। সাধারণ সময়ে মৌসুমি জ্বর সর্দি কাশির জন্য বেশিরভাগ লোক স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনে নিয়ে সেবন করেন। বর্তমানে জ্বর-সর্দিকাশির জন্য ফার্মেসিগুলোও অধিক সতর্কতার কারণে রোগীদের ঔষধ না দিয়ে বিদায় করে দিচ্ছে। এমনকি ফার্মেসিতে যাবার পর ঐ ব্যক্তিকে করোনা আক্রান্ত মনে করে এমন ব্যবহার করা হচ্ছে যে, যত তাড়াতাড়ি তাকে সরিয়ে দেয়া যায় ততই মঙ্গল। হাসপাতালগুলো প্রায় রোগীশূন্য। যেখানে প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ডাক্তারের চেম্বার গুলোতে কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, সেখানে রোগীর সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। ডাক্তার না থাকায় ঘরে বসেই তাদের কাতরাত্বে হচ্ছে। গুটি কয়েক ডাক্তার আছেন তারা সুবিধা বুঝে, আত্মীয়-পরিজনের সুবাধে কোনোভাবে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। অধিকাংশ ডাক্তারই বলতে গেলে হোম কোয়ারেন্টিনে চলে গেছেন। চেম্বারগুলোতে তালা ঝুলছে। কোথায় কাকে গিয়ে দেখানো যাবে, তা-ও কেউ জানে না।
স্বাভাবিক সময়ে আমাদের দেশে ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেতে হলে চেম্বারে নির্দিষ্ট সময়ে অথবা ডাক্তারের চেম্বার সহকারীর মোবাইল ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করে টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। এখন সেই ব্যবস্থাও আর চালু নেই। সুতরাং করোনার পাশাপাশি সাধারণ মৌসুমী জ্বর সর্দি কাশিসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসার অবাধ সুযোগ না থাকলে সংকট মহাসংকটে রূপ নেবে। গত প্রায় আড়াইমাস যাবৎ চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই জটিলতা চলছে। যারা জটিল রোগী, নিয়মিত ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ সেবন করে বেঁেচ আছেন। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছেন তারা। সিলেটের ডাক্তারপাড়া বলে খ্যাত নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেটেই ৯০ভাগ ডাক্তারের চেম্বার। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন হাজারো রোগীর ভিড় থাকে এখানে। বর্তমানে স্টেডিয়াম মাকের্টের ভিন্ন চিত্র। ৯০ভাগ ডাক্তারের চেম্বার তালা বদ্ধ। ডাক্তার ও রোগীশূন্য এই স্টেডিয়াম এলাকা। প্রতিদিন অধিক হারে মৃত্যুর সংবাদ শুনতে হচ্ছে। করোনার নির্দিষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্র ও রোগীর সংখ্যা নির্ণয়ে প্রতিদিন করোনার মৃত্যুর চেয়ে বাইরে থেকে মৃত্যুর খবর আসছে অধিকহারে। এতে প্রতীয়মান হয় চিকিৎসা না পেয়েই তারা প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রাইভেট চেম্বারে ডাক্তার বসছেন না।
সুতরাং অনেকেই আল্লাহর উপর ভরসা করে ঘরে বসে আছেন।
এমনিতেই করোনা ভীতি সমাজ জীবনে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সাধারণ জ্বর-সর্দিকাশিতে মৃত্যু বরণ করেও অতি সতর্কতার কারণে মৃত ব্যক্তির দাফন কাফন থেকে শুরু করে পরিবারের পরবর্তী জীবন ব্যবস্থাও জটিল হয়ে উঠছে। বর্তমান আতঙ্কিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মৃত্যুকেও যেন স্বাভাবিক মেনে নিতে দশবার ভাবতে হচ্ছে। এক ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করেই শেষ নয়। প্রথম দফায় গোটা পরিবারকে যেতে হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টিনে। গ্রামে যেন তারা এক ঘরে হয়ে গেলেন। অজানা আতঙ্ক প্রতিবেশীরাও তাদের এড়িয়ে চলছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার বছরের মধ্যে এই মৌসুমেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ইনফেকশন (এআরআই) বলতে সর্দি–কাশি, গলাব্যথা থেকে শুরু করে ব্রঙ্কাইটিস (শ্বাসনালির ভেতরে আবৃত ঝিল্লিতে সংক্রমণ), ব্রঙ্কোলাইটিস ও নিউমোনিয়াকে বোঝানো হয়ে থাকে।
নিয়ন্ত্রণকক্ষের তথ্যমতে, এ বছরের মার্চে গত বছরের মার্চের তুলনায় এআরআইতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এ বছর ৩০ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৯৩০। এর আগের বছর অর্থাৎ, ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮২০, ২০১৮ সালে ১০১০ এবং ২০১৭ সালে ১৪১ জন। একইভাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এআরআইতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৯৫০, গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৬০। এর এক মাস আগে অর্থাৎ, জানুয়ারিতে রোগীর সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৬৪১। গত বছরের জানুয়ারিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৫২০।
গত চার বছরের তুলনায় এ বছরই শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এত বেশি কেন, এ প্রশ্ন তুলছেন খোদ চিকিৎসকরাই। তারা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে এটিপিক্যাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের অবশ্যই করোনা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৯ জন।
করোনা পরিস্থিতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সার্বিক ভাবে চিকিৎসায় অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা মানুষকে উৎকন্ঠায় রেখেছে। এনিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় কঠোর হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রথম দিকে চিকিৎসা না পেয়ে ২জন মহিলার মৃত্যুর ঘটনার পর চিকিৎসা না দিয়ে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বেসরকারি ৬টি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়। এরপর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের হুসিয়ারী সত্তেও পুণরায় ঘটে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা।
গত ৩১ মে রাতে সিলেট নগরীর কাজিরবাজার মোগলটুলার শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মনোয়ারা বেগম নামের এক নারীকে নিয়ে ৬টি হাসপাতালে ঘুরেন তার স্বজনরা। কিন্তু কোনো হাসপাতালই তাকে চিকিৎসা দেয়নি। ওই নারী দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অ্যাজমা রোগী এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেখানোর পরও কোনো হাসপাতাল তাকে ভর্তি করেনি। অবশেষে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান ওই নারী। একই রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল কালীঘাট এলাকার এক নারীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসা হয় সিলেটে। কিন্তু ৭টি হাসপাতাল ঘুরে ওই নারীও কোনো চিকিৎসা পাননি। পরে অ্যাম্বুলেন্সেই তিনি মারা যান। ওই নারীর আত্মীয় মাজহারুল আলম মাসুম জানান, ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে প্রেশার ও ডায়বেটিসে ভুগছিলেন।
দেশের সব সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও সিলেটে সামান্য জ্বর বা শ্বাসকষ্ট থাকলেই চিকিৎসা দেয়া থেকে বিরত ছিলেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো। গত ২জুন ৬টি হাসপাতাল ঘুরে এ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেলেন নারী’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ প্রকাশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট অফিস থেকে অভিযুক্ত হাসপাতালগুলোকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়।
সিলেট নগরীর ৪টি হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে বন্দরবাজার এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী চিকিৎসার অভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ৫জুন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইকবাল হোসেন খোকার বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন সোবাহানীঘাট এলাকার একটি হাসাপাতালে এম্বুলেন্সের জন্য কল করা হয়। অ্যাম্বুলেন্স বাসায় আসার পর দেখা যায় এর সাথে যে অক্সিজেন সিস্টেম রয়েছে সেটি ভাঙা। তাই এই অবস্থায়ই রোগীকে সোবাহানীঘাটের ঐ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বার বার তাদেরকে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করলেও তারা রোগীকে রেখে নিয়মকানুন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান। এক পর্যায়ে তারা রোগীকে না রেখে নর্থ ইস্ট হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। অনুরোধ করার পরও তারা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে দেননি। পরে রোগীকে নিয়ে দক্ষিণ সুরমার নর্থ ইস্ট হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ জানান, তাদের হাসপাতালে সিট নেই, রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। তখন এক চিকিৎসক পরামর্শ দেন শহীদ ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। শামসুদ্দিন হাসপাতালে গিয়ে সবকিছু বন্ধ পাওয়া যায়। ১০-১৫ মিনিট পরে এক নিরাপত্তাকর্মী এসে জানান হাসপাতালের সবাই ঘুমে। অন্য কোথাও রোগীকে নিয়ে যেতে। তখন তারা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হন। সেখানে জরুরি বিভাগে যাওয়ার পর তারা সিসিইতে নিয়ে একটি ইসিজি করেন। এরপরই হাসপাতালের ইর্মাজেন্সিতে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। করোনার এই সংকটে সিলেটের ডা. শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালটি সিলেটের একমাত্র ‘করোনা হসপিটাল’। সেখানে গিয়ে শুনা যায় সবাই ঘুমে। তাহলে সেখানকার পরিস্থিতি কী হতে পারে। করোনার এই সংকটে মানুষ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসছে। সেবা দিচ্ছে মানবতাবাদী ডাক্তার, নার্স, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন, পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, সাস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী। আর এই মনোবল নিয়ে আমাদেরকে সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এক মাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের গেটের সামনে ফেলে রেখে গেছে তার ছেলে। ঘটনা জানাজানি হলে হাসপাতাল ক্যাম্পের পুলিশ উদ্ধার করে ওই নারীকে করোনা ইউনিটে ভর্তি করে দিয়েছে। ৬ জুন দুপুরে বেলা ৩টার দিকে মনোয়ারা বেগম (৫০) ওরফে মনিরা নামের ওই নারীকে ঢামক করোনা ইউনিটের নতুন ভবনের ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এ ব্যাপারে ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের সহকারী ইনচার্জ (এএসআই) আব্দুল খান জানান, দুপুরে খবর পাই এক নারী হাসপাতালের নতুন ভবনের সামনে পড়ে আছেন। তার ছেলে করোনা সন্দেহে তাকে ফেলে রেখে গেছেন। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। পরে তাকে উদ্ধার করে করোনা ইউনিট নতুন ভবনের ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডের ১০ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়। নিজের ছেলে মাকে ফেলে চলে গেলেও সেই পুলিশ সদস্য নিজেকে প্রকৃত মানবসেবক হিসাবে এখানে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে অনেক পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনীর সদস্য নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মানুষের কল্যাণে জীবনবাজি রেখে কাজ করছেন এই করোনা সংকটে। করোনায় মারার যাওয়ার কারনে নিজের স্বজনরা দাফনে এগিয়ে আসেনি কিন্তু তাই বলে লাশ পড়ে থাকেনি। এগিয়ে এসেছে অন্যরা। এই ভাবেই মানবতার হাত প্রসারিত হচ্ছে।
সিলেটে বিনা চিকিৎসায় পর পর মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সিলেট-১ আসনের সাংসদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে তিনি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের সাথে কথা বলেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘অন্য সময় রোগীদের নিয়ে বাণিজ্য করা হয়। আর এখন দুঃসময়ে তাদেরকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে না, এটা হতে পারে না। কঠিন সময়ে যদি পাশে না থাকে, তবে আর এসব হাসপাতাল দিয়ে কী হবে। ড. মোমেন জানান, সিলেটের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে সকল হাসাপাতালকে কোভিড-১৯ ও নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ফুঁসে উঠার চিত্র ও সরকারের এই নির্দেশ পাওয়ার পর রোগী ভর্তিতে সক্রিয় হয়েছেন বেসরকারি হাসাপাতালের উদ্যোক্তারা। ৮ জুন সিলেট প্রাইভেট হসপিটাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত বক্তব্যে বলেন, গত সপ্তাহে তিনজনের অনাকাঙ্খিত মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য আমাদের বেসরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো প্রস্তুত নয়। প্রতিটি হাসপাতালের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ একটি। ফলে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিলে অন্য রোগীরাও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরই নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে সম্পূর্ণভাবকে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় জন্য নিবেদিত করার প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এ প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেনি। যদিও ঢাকার অনেক ও চট্টগ্রামের দুটি বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থায় কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু সিলেটে এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আয়োজকরা বলেন, এ অবস্থায় অ্যাসোসিয়েশনের জরুরি সভায় মাউন্ট এডেরা হাসপাতাল ও নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। এই দুটি হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোনো হাসপাতালে রোগী গেলে তাদের আইসোলেশনে রেখে অক্সিজেন প্রদান করে রোগীর পছন্দমতো কোভিড-১৯ চিকিৎসার হাসপাতালে প্রেরণ করা হবে। প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করা হবে। তারা বলেন, অবকাঠামো ও জনবল সঙ্কট থাকায় বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় ক্ষেপণ হয়েছে। এছাড়া আমরা আশা করেছিলাম, সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে দু’একটি বেসরকারি হাসপাতালকে সম্পূর্ণভাবে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করবে। সংবাদ সম্মেলনে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের প্রণোদনা ও স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রদানের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়।
বেসরকারি হাসপাতাল গত আড়াইমাস সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। করোনার চিকিৎসার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। সরকারের সাথে করোনা চিকিৎসায় তাদের হাসপাতাল ব্যবহার নিয়ে সমঝোতা হয়নি। কিন্তু হাসপাতালে নন কোভিড রোগীর চিকিৎসা প্রদানে বাধা ছিল না। যে প্রক্রিয়ায় বর্তমানে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিধি মেনে সাধারণ নিয়মেই হাসপাতলগুলোতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব ছিল। মানুষ চিকিৎসা বঞ্চিত হওয়ার জন্য দায়ী কে? বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর এই দায় কে নেবে ?