শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

একবছর ধরে দখলে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া



চোরাই লাইনে মেলার আলোকসজ্জা!
পূবের হাওয়া ডেস্ক :::
সিলেট নগরীতে এমনিতেই খেলার মাঠের সংকট। এ সংকটকে আরো ঘনিভূত করে তুলেছেন সিলেটের এক শ্রেণীর মেলা ব্যবসায়ী। শুধুমাত্র মেলার নামে সিলেটের শাহী ঈদগাহে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম এক বছর দখলে রেখে স্থানীয়দের খেলাধূলা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। করোনার এই মহামারীতে মেলা সিন্ডিকেটের দখলে থাকা শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামে নারী উদ্যোক্তাদের সম্মেলন ও পণ্য প্রদর্শণীর নামে চালানো হচ্ছে বাণিজ্য মেলা। এক বছর ধরে মাঠ দখলে রাখার পাশাপাশি বড় অংকের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়ে থাকলেও এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নারী উদ্যোক্তাদের সম্মেলন ও পণ্য প্রদর্শণীর নামে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনুমোদন ছাড়াই চলছে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামে বাণিজ্য মেলা। আর এ মেলার আয়োজক হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে সিলেট উইমেন্স চেম্বারকে। এ চেম্বারের সভাপতি স্বর্ণলতা রায়ের সাথে মেলা সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য আবদুল গফ্ফারের গোপন দফারফার মাধ্যমে সিলেটের শাহী ঈদগাহ এলাকায় প্রদর্শনীর নামে চলছে মেলা। সরকার লোকসমাগমে নিরুৎসাহিতকরণ, মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দুরত্ব নিশ্চিতে তাগিদ দিচ্ছে । সেখানে মেলায় প্রতিদিনই হচ্ছে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়।
অনুমোদনের সকল শর্ত লঙ্ঘন করে মেলা চলতে থাকায় প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেটে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়ামের এ মাঠে কোনো ধরণের স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। প্রশাসনের লোকজনের সামনে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। শাহী ঈদগাহ ময়দানে বিকেলে হাঁটতে বের হওয়া ব্যবসায়ী ইসলাম আলী বলেন, করোনা পরিস্থিতি ফের বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এমনিতেই আতঙ্কিত। এ অবস্থায় মেলা চলছে। প্রশাসনের উচিত সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মেলা দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া। মেলায় সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের আনাগোনা থাকায় কখন, কার মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়বে তার নিশ্চয়তা নেই। গতকাল ২৪ ঘন্টায় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবে সিলেটের ৩৮ জনের করোনা পজিটিভ আসে। এই ৩৮ জন কিংবা তাদের সংস্পর্শে আসা লোকেরা মেলায় যে যান নি, তার নিশ্চয়তা কী?
টিবি গেইট এলাকার বাসিন্দা দিলওয়ার হোসেন বলেন, খেলার মাঠ দখলে রাখা হয়েছে একবছরের বেশি সময় ধরে। করোনাকালে মানুষের ইমিউনিটি বাড়াতে যেখানে ব্যায়াম দরকার সেখানে সকালে হাঁটাচলার মাঠটি দখলে রাখা হয়েছে। সরকার একদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানার তাগিদ দিয়ে পরিপত্র জারি করছে, অন্যদিকে সিলেটের প্রশাসন কোন অদৃশ্য ইঙ্গিতে মেলার অনুমতি দিয়েছে, তা বোধগম্য হচ্ছে না। স্থানীয় ছেলেরা বিকেলে একটু খেলার জায়গা পাচ্ছে না। দ্রুত মেলা উচ্ছেদ করে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম মাঠটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।
এদিকে একটি সূত্র জানিয়েছে, মেলা কর্তৃপক্ষ একটি বাণিজ্যিক লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ লাইনের বিদ্যুৎবিলও বকেয়া রয়েছে। একটি লাইন বৈধ থাকলেও মেলা কর্তৃপক্ষ অবৈধ লাইনে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্টলদাতা বলেন, এক বছর ধরে মেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। গত বছরও ব্যাপক আলোকসজ্জা করা হয়েছিল। সে সময় আমরা জানতে পারি মেলায় চোরাই লাইনে আলোকসজ্জা করা হচ্ছে। মূল লাইন থেকে দিনের বেলা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও রাতের বেলার আলোকসজ্জায় চোরাই লাইন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। মেলাস্থলে স্থাপিত ৩৬টি সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং করা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের গাড়ি মেলাস্থলে আসছে কী না।
এদিকে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনসহ মেলার শর্ত না মানায় দ্রুতই মেলার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাচ্ছে প্রশাসন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, মেলায় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করাসহ শর্থ লঙ্ঘনের কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেলা শেষ করার জন্য সিলেটের জেলাপ্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম আয়োজকদের জানিয়ে দিয়েছেন।
প্রশাসন বলছে, মেলায় পদে পদে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। এতে করে সিলেট অঞ্চলে করোনার প্রকোপ বাড়তে পারে। মেলার গেটসহ বিভিন্ন স্থানে ‘নো মাস্ক, নো এন্ট্রি লেখা’ থাকলেও তার মানা হচ্ছে না। মেলার প্রবেশপথে একটি আর্চওয়ে টাইপ গেইট ও একজনের হাতে থার্মোমিটার থাকলেও শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রবেশ টিকিট পরীক্ষা করেই তারা দায় এড়াচ্ছেন। এছাড়া প্রদর্শনীর আড়ালে চলা এ মেলায় নানা ধরণের বিনোদনের রাইড বসানো হয়েছে। এ সকল রাইডে সাধারণ মানুষ মাস্কবিহীন গাদাগাদি করে বসছেন। এক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না সামাজিক দুরত্বও।
এদিকে সরেজমিনে মেলার মাঠে দেখা যায়, মেলায় নারী উদ্যেক্তাদের পণ্য প্রদর্শণীর কথা থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। হাতে গোনা কয়েকটি স্টলকে দুভাগ করে বিভক্ত করে স্থানীয় নারী উদ্যেক্তাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো বড় স্টল কিংবা প্যাভিলিয়নে নারী উদ্যেক্তাদের দেখা যায়নি। এদিকে মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিলেটের জেলা প্রশাসক মেলার পরিসর সংক্ষিপ্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি জানান, আগের দিন মন্ত্রনালয় থেকে তার কাছে চিঠি এসেছে। যাতে জনসমাগমে নিরুৎসাহিত করা হয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার ও মিডিয়া অফিসার বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের সবুজ সিলেটকে বলেন, মেলা আয়োজকরা শর্ত মোতাবেক কাজ করছে না, এটা লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের পেট্রোল পার্টিও কাজ করছে। জেলা প্রশাসক মহোদয় সামগ্রিকভাবে মেলা সংক্ষিপ্ত করার জন্য বলেছেন।

  •