রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

যাদুকরী এই গাছে ফোন রাখলে আসে নেটওয়ার্ক



আশফাক জুনেদ, বড়লেখা :: ইমরান আহমদ নামের এক সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক একটা গাছের সাথে ফোন আটকিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পাশে আরও দুই তিনজন। কৌতূহলী হয়ে এভাবে গাছের সাথে ফোন আটকিয়ে দাঁড়ানোর কারণ জানতে চাইলে ইমরান আহমদ জানান এক আশ্চর্যজনক তথ্য। এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, এই গাছে ফোন রাখলে নাকি নেটওয়ার্ক আসে। আশপাশের কোথায় নেটওয়ার্ক নেই। এই গাছে ফোন রাখলে ফোনে নেট আসে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে প্যাসেঞ্জারের কল আসে। যার জন্য স্থানীয় সিএনজি চালিত অটো চালকেরা সবাই এই গাছে ফোন আটকিয়ে রাখেন। যাতে ফোনে নেট থাকে। অনেকে এই গাছকে গরিবের নেটওয়ার্ক টাওয়ারও বলে থাকেন।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাল্লাতল চা বাগান স্ট্যান্ডের ঘটনা এটি। দূর্গম এলাকা হওয়ায় এই এলাকায় কোন মোবাইল টাওয়ার নেই। যার ফলে নেটওয়ার্ক নিয়ে চরম বিড়ম্বনায় পড়েন এই এলাকার মানুষেরা। দেশ ডিজিটাল হলেও প্রান্তিক এই এলাকা এখনও ডিজিটালের ছোয়ার বাইরে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলেও এই এলাকায় এখনও পৌছেনি মোবাইল নেটওয়ার্ক। নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে এই এলাকার হাজারো মানুষেরা চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয় । সরকারের দেওয়া ডিজিটাল বাংলাদেশর সুবিধা থেকে বাদ পড়ছে প্রায় কয়েক হাজার মানুষ। সরজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এসব তথ্যচিত্র উঠে আসে।

বড়লেখার সীমান্তঘেষা উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়ন। ৬৪.৭৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ইউনিয়নের অবস্থান। ইউনিয়নের পূূূর্ব ও দক্ষিন এলাকা জুড়ে রয়েছে পাল্লাতল চা বাগান, পান পুঞ্জি, বেরেংগা পুঞ্জি,আয়সাবাগ চা বাগান, কুমারশাইল চা বাগান, কুমারশাইল পান পুঞ্জি,অহিদাবাদ চা বাগান, ও ফতেহবাগ চা বাগান। এসব এলাকার যেদিকে থাকাবেন শুধু উচু নিচু পাহাড় আর পাহাড়। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় স্থান। রাস্তাঘাট কার্পেটিং ধারা উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে ও উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীনের কয়েকযুগ পেরিয়ে গেলেও এসব এলাকায় কোন মোবাইল কোম্পানি টাওয়ার বসাতে আসেনি। অথচ এসব এলাকার গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ফায়দা লুটে নিচ্ছে।

রুবেল মিয়া নামের এক কম্পিউটার অপারেটর বলেন, সরকার আমাদের জন্য অনেক কিছু করছে। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। কিন্তু আমরা এখনও পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের পাল্লাতলে নেটওয়ার্কের একটা বিশাল সমস্যা। এখানে নেট মিলে না। আমরা প্রয়োজনীয় কিছু ইউটিউবে খুঁজতে পারিনা। কাউকে ফোন দিতে পারি না। নেটওয়ার্ক খুঁজতে পাহাড়ের উপর উঠতে হয়।

চা শ্রমিক নেতা রীনা বলেন, আমাদের এখানে নেটওয়ার্কের সমস্যা। কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনা। নেটের জন্য এখানে হাহাকার। আমরা এর সমাধান চাই।

সরেজমিনে এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায় চা বাগান অধ্যুষিত এসব এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু স্থান ছাড়া কোথাও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কোথায় কখন নেটওয়ার্ক থাকে কেউ বলতে পারে না। জুরুরি প্রয়োজনে কোথায় ফোন করতে হলে চরম দূর্ভোগে পড়েন স্থানীয় মানুষেরা। আন্দাজের উপর কেউ গাছের সাথে, কেউ বাঁশের উপর কিংবা পাহাড়ের উপর ফোন রেখে নেটওয়ার্ক খুঁজেন। ভাগ্যগুণে এসব জায়গায় নেটওয়ার্ক থাকে আবার অনেক সময় থাকে না।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায় , ২০১৯ সালে রবি কোম্পানি পাল্লাতল চা বাগান এলাকায় তাদের টাওয়ার স্থাপনের জন্য এগিয়ে আসে। এজন্য তারা মাটি পরিক্ষাও করে। কিন্তু টাওয়ার স্থাপনের জন্য নির্ধারিত জায়গার মালিকানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত টাওয়ার স্থাপনের কাজ স্থগিত করে দেওয়া হয়। টাওয়ার নির্মানের খবরে এলাকার মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হলেও শেষপর্যন্ত টাওয়ার নির্মান কাজ স্থগিত হওয়ায় তারা হতাশ হন।

স্থানীয়রা জানান, জরুরি প্রয়োজনে কারো সাথে যোগাযোগ করার জন্য এখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। নেটওয়ার্ক খুঁজার জন্য পাহাড়ের উপর উঠতে হয়। এছাড়া ভালো নেটওয়ার্ক না থাকার কারনে ছাত্রছাত্রীরা অনলাইনে ক্লাস করতে পারে না। বিশেষ করে পড়ালেখার দিক দিয়ে খাসিয়া আদিবাসী ও চা জনগোষ্ঠী অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমান এই করোনার প্রাদুর্ভাবে তারা বই বা পড়াশুনার কথা ভুলেই গেছে। বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে এসেও এসব প্রত্যন্ত অঞ্চল নেটওয়ার্কের বাহিরে এটা কল্পনা করা যায় না।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি তামলিমন বারে বলেন, আমরা এমনিতেই অবহেলিত। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে মানুষ ঘরে বসে ইন্টারনেটের সাহায্যে সকল সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু ডিজিটাল দেশে আমাদের পাল্লাতল চা বাগান, পানপুঞ্জিতে নেটওয়ার্ক পৌঁছেনি। বর্তমানে করোনা মহামারীর কারণে স্কুল কলেজ বন্ধ। সবাই ঘরে বসে অনলাইনে ক্লাস করছে। কিন্তু আমাদের পাল্লাতলের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত থাকছে। অনলাইনের মাধ্যমে মুহুর্তেই যখন সারা দুনিয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এমন সময় পাল্লাতলের মানুষ অনেক খবর পাচ্ছেই না। তার কারণ নেটওয়ার্ক। স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও এখানে কেউ টাওয়ার বসাতে আসেনি। আমরা টাওয়ার বসানোর জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করবো।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম আল ইমরান বলেন,বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পাল্লাতল চা বাগান এলাকা নেটওয়ার্কের বাহিরে রয়েছে। পাল্লাতল চা বাগান এলাকার মানুষের মোবাইল নেটওয়ার্কের দূর্ভোগ নিরসনে কোন মোবাইল কোম্পানি টাওয়ার স্থাপনে এগিয়ে আসলে তারা উপকৃত হবে।

এ বিষয়ে গ্রামীন ফোন কোম্পানির সুপারভাইজার শিমুল আহমদ বলেন, কোন এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকলে বা
টাওয়ার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকলে আমাদের অফিস বরাবর লিখিত আবেদন করতে হবে। সেক্ষেত্রে টাওয়ার স্থাপনের বিষয়টি অফিস বিবেচনা করবে।

  •