রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে উৎপাদিত হবে দুই শ ৫০ কোটি টাকার ধান!



সামিউল কবির, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ:: সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জে দেখার হাওর’ ও সাংগাই হাওর, জামখলা হাওর, খাই হাওর, কাউয়াজুরী হাওর, পিপড়াকান্দি হাওর সহ ছোট বড় মিলিয়ে ১৮ টি হাওরে বোরো ফসল ফলেছে।
ইতিমধ্যে ধান কাটা রয়েছে প্রায় শেষের পথে। হওরের বড় চ্যালেঞ্জ সবসময় প্রকৃতির খেয়ালিপনার কাছে হেরে গিয়ে মাঝে মাঝে জিতেও যায় এ এলাকার কৃষি জনপদ। যখন প্রাকৃতিক বন্যা ও শিলাবৃষ্টিজনিত কারণ ফসল নষ্ট হয়ে যায় তখন হাওরবাসীর মনে হাহাকার পড়ে। কিন্তু এবার মওসুম ভালো থাকায় কাঙ্খিত ফলন হয়েছে হাওরে। হলুদরঙা ধানের সাগরে রূপ নিয়েছে উপজেলার সবগুলো হাওরে। সেখানে কাস্তে, ওকন, ঠুকরি-বস্তা হাতে ব্যস্ত লাখো কিষাণ-কিষাণী। শ্রমিক নিয়ে হাওরে ব্যস্ত কৃষক। তাদের স্ত্রী কন্যারা ব্যস্ত ধানখলায় ধান শুকানো ও গোলায় তোলা নিয়ে মগ্ন।
চোখ মেললেই দেখা যায় হাওরের চারদিকে এখন বিস্তৃত ধানক্ষেতে হাউয়ার ঢেউ। দৃষ্টির চত্বরে কেবলই সোনালী পাকা ধান আর ধান। কখনো কখনো কালবৈশাখির চোখরাঙানি আর শিলার রূপ দেখে বিচলিত হচ্ছেন কৃষক। বর্তমানে ধান তোলার একটা উৎসব চলছে হাওরে। পরিশ্রমের নোনাঘাম ঝরানো একমাত্র ফসল গোলায় তোলতে এখন লাখো কৃষক অস্তির সময় পার করছেন হাওরে। জেলা এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও মওসুমি শ্রমিকরা ধান কাটতে এসেছেন হাওরে। ধান কেটে তারা বছরের খোরাক সংগ্রহ করে ফিরবেন বাড়ি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে রয়েছে। ফলন ভালো হওয়ায় লাভবান হবেন এমনটা আশা কৃষকের। এই মুহুর্তে ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা।  আর কিছুদিন গেলেই ধান গোলায় তুলা শেষ হবে এ উপজেলায়। তাই কৃষক ও শ্রমিকের মুখে সোনালী ফসলের হাসির ঝিলিক দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, চলতি বছরে এ উপজেলায় ২২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।  ধান উৎপন্ন হবে এক লক্ষ ১০ হাজার মেট্রিকটন। যার বাজার মূল্য হবে ২৫০ কোটি টাকার উর্ধে।
শুক্রবার(৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের সাংগাই ও দেখার হাওরের ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায় দলে দলে ধান কাটছে শ্রমিকরা। কৃষক জাঙ্গালে দাড়িয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং কাজেও সহযোগিতা করছেন। কয়েকটি গোপাট ঘুরে দেখা গেছে চারদিকেই বিস্তৃত পাকা ধান ক্ষেত। সবদিকেই ধান কাটছে হাজারো শ্রমিক। অন্যের দিকে থাকানোর সময় তাদের হাতে নেই। আসন্ন বিপদের কথা আঁচ করতে পেরে সবাই ধান কাটায় বিভোর। কাটা ধান অটো রিক্সা ও ইঞ্জিন চলিত গাড়ি, গরু, মহিষের গাড়ি দিয়েও খলায় ধান আনছেন কৃষক ও তাদের সন্তানরা। জাঙ্গালে খলায় খড় শুকাচ্ছেন গবাদি পশুকে খাওয়াতে। ধানের  খলায় শত শত কিষাণ-কিষাণী সন্তান সন্ততি নিয়ে কাজ করছেন অবিরত।
সুলতানপুর গ্রামের কৃষক হারিশ আলী (৫৬) এ বছর প্রায় ৬ একর জমিতে ধান লাগিয়েছেন। এখন তার ধান কাটছেন শ্রমিকরা। গত ৩ বছর ধরে তার ক্ষেতের ধান কেটে দিতে আসছেন বাহিরের ও আশপাশের গ্রামের শ্রমিকরা। হাওরে দাঁড়িয়ে তিনি শ্রমিকদের নির্দেশনার সঙ্গে ধানের মুঠি টানার কাজও করছেন।
ধান কাটার শ্রমিক আবু বক্কর বলেন, ‘বৈশাখও দিন মাদান বালা থাকেনা। যে কোন সময় তুফান টাটা (বজ্রপাত) আইতে পারে। এতে আউরো ধান কাটার শ্রমিকরা মারা যায়। তার বাদেও পেটের জ্বালায় এতো ঝুঁকির মধ্যেও আমরা এ কাজ করি। সরকার যদি টাটা বন্ধে কোন ব্যবস্থা নিতো তাইলে শ্রমিকরাও বাঁচতো। কৃষকরাও ধান কাটা নিয়ে চিন্তায় থাকতোনা।
জমির মালিক হারিশ আলী বলেন, ‘দেখার হাওর আমরার আশির্বাদ এবং অভিশাপেরও নাম। তবে গত তিন বছর ধইরা আশির্বাদ দিছে দেখার হাওর। আমরা ভাড়াল ভরে ধান তুলছিলাম। ইবারও দিন মাদান বালা থাকায় মনে অয় সব ধান তুলতাম পারমু। তিনি বলেন, ‘ই ধানের উফরেই আমরার বাইচ্চা থাকা, বিয়ে সাদি-লেখাপড়া আর জীবন ধারনের সব খরচ করি। ধান মাইর গেলে আমরার কান্না কেউ দেখার নাই।’
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব আল মারুফ বলেন, ইতিমধ্যেই হাওরের বেশিরভাগ ধান কাটা শেষ। উপজেলায় ধান কাটার শ্রমিকের পাশাপাশি হারভেস্টার (ধান কাটার মেশিন) রযেছে। আমরা আশা করছি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সব ধান গোলায় তুলা শেষ হবে। এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শেষে কৃষকরা ভালোভাবেই ফসল ঘরে তুলে লাভবান হবেন।
এ ব্যাপারে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা  পরিষদের  ভাইস  চেয়ারম্যান  প্রভাষক  নূর  হোসেন  বলেন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের হাওর গুলোতে এবার ধান ভালো হয়েছে, ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। আমাদের উপজেলায় ধান কাটার কোন শ্রমিক সংকট নেই।  ফসল ভালো হওয়ায় এবং ধানের নায্য দাম থাকায় এ বছর কৃষকরা লাভবান হবেন।
  •