শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাঙালি ও বাংলাদেশের : অমর কাব্য হারুন হাবীব



সেই আদিকাল থেকে সম্রাটÑরাজা, ধর্মবেত্তা, রাষ্ট্র ও সমর নায়কদের প্রভ‚ত গুরুত্বপহৃর্ণ ও স্মরণীয় ভাষণের কথা আমাদের জানা আছে, যা যুগে যুগে একেকটি জনপদের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে, সাহসী হয়ে সামনে এগোবার পথ দেখিয়েছে। সেসব কালজয়ী ভাষণ সভ্যতা বিনির্মাণে সহায়ক হয়েছে, মানুষকে অগ্রসরতার দিকে ধাবিত করেছে। আবার এমন কিছু ভাষণ আছে, যা কোনো কোনো জনপদের বন্দিত্ব বা পরাধীনতা ঘুচিয়েছে, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। সেসব সম্মোহনী ভাষণের শক্তি মানুষকে তার আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়তে বা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে শক্তি দিয়েছে।

অবশ্য কিছু কিছু ভাষণ অনেক ক্ষেত্রে প্রলয়েরও সৃষ্টি করেছে, নিরন্তর সংঘাত ও রক্তপাতেরও কারণ হয়েছে। ১৯৯৫ সালে পোপ উরবান-২-এর ক্লারমাউন্টে দেওয়া বহুলালোচিত ভাষণের কথা আমরা জানিÑ‘ধষষ যিড় ফরব…ঝযধষষ যধাব রসসবফরধঃব ৎবসরংংরড়হ ড়ভ ংরহং’ এবং এটিও জানি যে, সেই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ ক্রুসেডে নেমে পড়েছিল, যা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডার দি গ্রেট ভারত অভিযান পরিচালনা করেন। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাজা পুরুকে এক বিপদসংকুল যুদ্ধে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডার আর পহৃর্বে দিকে অগ্রসর হতে পারেননি; আরও বড় প্রতিরোধ চিšøা করে পিছিয়ে গেছেন। সেই সংকটে তার বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে তিনি যে ভাষণটি রেখেছিলেন, তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দাশপ্রথা বিলোপ এবং আমেরিকার সমাজে শান্তি পুনরুদ্ধারে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে ১৮৬৩ ও ১৮৮৫ সালে আব্রাহাম লিংকনের দুটি ভাষণ বিশ^ ইতিহাসে অমর স্থান নিয়েছে। ১৯৪০ সালের দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ভয়ংকর সময়ে উইন্সস্তন চার্চিলের ভাষণ ইংল্যান্ড, ইউরোপে ঐতিহাসিক ভ‚মিকা পালন করেছে। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ছঁরঃ ওহফরধ ভাষণটি ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্থ করেছে। ১৯৬১ সালে জন এফ কেনেডির বিখ্যাত ভাষণের কথা আমরা জানি। ১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই অমর ভাষণÑ ও যধাব ধ ফৎবধস-এর কথাও জানি আমরা। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত জেনারেল অগাস্তো পিনোসেটের সামরিক বাহিনী যখন সমাজতন্ত্রী সালভেদর আলেন্দেকে ঘিরে ফেলে এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে থাকে, ঠিক তখনই আলেন্দে রেডিওতে যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি রেখেছিলেন, সেটিও অমহৃল্য সম্পদ হয়ে আছে চিলির গণমানুষের জন্য। তবে সব ঐতিহাসিক ভাষণ সমান গুরুত্ব বহন করেনি।
৭ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি বাংলা ও বাঙালি জীবনের এক অমর মহাকাব্য, যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের নির্মোহ ইতিহাস। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ^ সংস্থা ইউনেস্কো ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ^ ঐতিহ্যের দলিলে স্থান দিয়েছে। আমি বিশ^াস করি, বাংলাদেশের জাতির পিতার সেই ভাষণ বিশ^ঐতিহ্য দলিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম আরেক দফা বিশ^স্বীকৃত হয়েছে। এই স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল, যে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ১৯৭১ সালে, কেবল তারই বিশ^স্বীকৃতি নয়; এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের গণমানুষ যে ন্যায় সংগ্রাম পরিচালিত করেছিল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, তারও স্বীকৃতি। অন্যদিকে এই স্বীকৃতি সেই বাঙালি মহাপুরুষের, যিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর মাটি ও মানুষের জন্য । আমরা বিশ^ সংস্থা ইউনেস্কোকে আরও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি বাংলাদেশের ২১ ফেব্র“য়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার জন্য।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণটি কেন অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরে নির্মোহ ইতিহাস, কেন তা বাংলাদেশের জšে§র ইতিহাসের মাইলফলক, কেন তা প্রভ‚ত তাৎপযপূর্ণ, সে নিয়ে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন হতে পারে।
প্রথমত, ভাষণটি খুবই সংক্ষিপ্ত এবং তাৎক্ষণিক, মাত্র ১৮ মিনিট বা তার সামান্য বেশি, ১১০৭ শব্দের। প্রায় সব অর্থেই এই ভাষণ একটি ক্লাসিক সাহিত্যের মর্যাদাসম্পন্ন, যাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোতে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনের মহাকাব্য বলা যায়। এর শব্দ চয়ন, আবেগ, ইতিহাসনির্ভরতা, অন্তর ও বাইরের সংযত ও পরিপাটি ভাষা এবং তার ছান্দিক গ্রন্থনা। একদিকে যেমন পাকিস্তানের ২৩ বছরের বাঙালি নিপীড়নের নির্মোহ ধারাবিবরণী; অন্যদিকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মানবিক সভ্যতার প্রতি এর রচয়িতার অবিচল আস্থা ও দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ।
মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু যখন রমনা রেসকোর্সে ভাষণটি রাখছিলেন, তখন যত্রতত্র পাকিস্তান বাহিনী বাঙালিদের হত্যা করা শুরু করেছিল; ১৯৭০-এর নির্বাচনী ফলাফল অস্বীকার করে অন্যের ভাষা ব্যবহার শুরু করেছিল। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও তার সেনাবাহিনী ঢাকা বিমানবন্দর এলাকা, ঢাকা সেনানিবাসে যুদ্ধবিমান ও কামানসহ অপেক্ষা করেছিল, যাতে স্বাধীনতা ঘোষিত হলেই আক্রমণ পরিচালনা করা যায়। অনুধাবনযোগ্য যে, জাতির পিতাকে সবদিক বিবেচনায় রেখে তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য রাখতে হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, চরম উত্তেজক পরিস্থিতিতেও বঙ্গবšুব্দ সেদিন ধৈর্য ও নিয়মতাšিস্লকতার প্রতি অবিচল আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন; বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর রাজনৈতিক দহৃরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অবিচল। কাজেই তিনি পাকিস্তানি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গণমানুষকে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দিয়েছিলেন, যে ডাক ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহৃল চালিকাশক্তি, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর শেষ নির্দেশনা এবং একই সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর বিক্রম ও ত্যাগের মহৃল উৎস।
আমরা যারা ঐতিহাসিক রেসকোর্সে উপস্থিত থেকে সেদিন ভাষণটি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম তারা জানি, কীভাবে একটিমাত্র ভাষণ গোটা জাতিকে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিবাহিনীতে পরিণত করেছিল এবং যে ভাষণে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদী নেতা সেদিন কার্যত পহৃর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন।
তৃতীয়ত, এই ভাষণে পাকিস্তানি সরকারকে অকার্যকর করতে বঙ্গবন্ধু এমন এক সর্বাÍক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, যা শাšিøবাদী ও গণতাšিস্লক রাজনীতি চর্চার বহিঃপ্রকাশ। একদিকে সম্ভাব্য যুদ্ধের পথে তিনি জাতিকে প্রস্তুত করেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানি স্বৈশাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছেনÑ আর নয় অনেক হয়েছে, এবার শেষ পরীক্ষা।
চতুর্থত, আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কেবল সময়ের চাহিদা পহৃরণ করেছে তাই নয়; একই সঙ্গে তা ভবিষ্যতের চাহিদাকেও পহৃরণ করে চলেছে। আজও বাঙালিকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, জাতিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ জাতিকে পথনির্দেশ করে, শক্তিতে বলীয়ান করে।
বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন শুদ্ধতম জাতীয়তাবাদী। একদিকে বাঙালি, অন্যদিকে আধুনিক মানুষ; যিনি পাকিস্তানি স্বৈরতšেস্লর ২৩ বছরের মধ্যে ১৩ বছরেরও বেশি সময় কারারুদ্ধ থেকেছেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসককুলের চরম নির্যাতন-আচরণেও তিনি ভাঙেননি, মোচড়াননি, পরাজিত হননি। নেতাজি সুভাষ বসুর পর তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুষ যৌবনশক্তির প্রতীক। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানের প্রাণের মানুষ, মনের মানুষ; সব ধর্ম-বর্ণের অধিকারবঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও সাহসের প্রতীক। আমার উপলব্ধিতে শেখ মুজিব ধারণ করেছিলেন তিতুমীরের অমিত বিক্রম, মহাÍা গান্ধীর সহিষ্ণু শাšিøবাদ, রবীন্দ্রনাথের প্রেম এবং সর্বভারতীয় সেনাপতি নেতাজি সুভাষের অসামান্য সাহস।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতার শততম জš§বার্ষিকীর মহাআয়োজনের মধ্যে ২০২০ সালের ৭ মার্চ উদযাপিত হচ্ছে। উপলক্ষটি ইতিহাসের আশীর্বাদ হয়ে আসুক, প্রার্থনা করি । গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে আমরা যেন সত্যিকারভাবেই জাতির পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারি, উদযাপনের সার্থকতা খুঁজে নিতে পারি। এই সার্থকতা তখনই সম্ভব, যখন গতানুগতিক বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে এই মহাপ্রাণের জীবন ও দর্শন নির্মোহভাবে চর্চিত হবে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু তাঁর কর্মময় জীবন, জয় বাংলা ও ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সময়ের আঙ্গিকে ধারণ, লালন ও চর্চা করতে হবে, জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে টেকসই করতে হবে।
এদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স ৫০ বছর পহৃর্ণ হতে যাচ্ছে। ২০২১ সালে মহাধুমধামে আমরা উদযাপন করব স্বাধীনতা সুবর্ণজয়šøী। এটিও আমাদের প্রজšে§র জন্য ইতিহাসের আরেক আশীর্বাদ। আমার বিশ^াস, এই দুই মহালগ্ন ঘিরে একটি তাৎপর্যপহৃর্ণ সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সহৃচনা হতে পারে, যদি আমরা জাগরিত হই। সেই জাগরণে রাজনৈতিক শক্তি যেমন শানিত হবে, একই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজের মনোজগৎ থেকে দীনতার কলঙ্ক-কালিমা অপসারণেরও সুযোগ তৈরি হবে। বিগত কয়েক যুগের ব্যবধানে লক্ষ্য করা গেছে, রাজনৈতিকভাবে উচ্চকণ্ঠ থাকা সত্তে¡ও অনেকেই আমরা দীনতামুক্ত স্বাধীন মানুষ হতে পারিনি। এই দুই ঐতিহাসিক মহালগ্ন যেন ইতিহাসের আশীর্বাদ হয়ে এসে আমাদের সেই দীনতা ঘুচিয়ে দেয়।
সে কারণেই প্রত্যাশা, নতুন প্রজšে§র মাঝে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যথার্থভাবে আসন করে নিক, রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষও মুক্ত হোক অšøরের কালিমা-কলঙ্ক থেকে। এ কাজটি কেবল স্লোগান দিয়েই হওয়ার নয়; প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে আÍায় ধারণ করা, আদর্শিকভাবে ঋদ্ধ হওয়া।
 লেখক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
  •