শুক্রবার, ২০ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আয়ু নিয়ে বসে আছি আলো-অন্ধকারে : মজনু শাহ



ইতালিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ৫০ দিন চলে গেল। এ দেশে এই বিপর্যয়ের মূল কারণ কী, এদের প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, না অন্য কিছু, এই প্রশ্নটা এখন উঠছে। এখানকার শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত বেরগামো শহরের ডা. ড্যানিয়েল ম্যাক্কিনির মর্মস্পর্শী সেই চিঠিতে হয়তো এর উত্তর আছে…‘আমাদের কারও কোনো দোষ নেই। যারা আমাদের অভয় দিয়েছিল, এটা তেমন ভয়ংকর নয়, সব দোষ তাদের। তারা বলছিল, এটা সাধারণ একটা ফ্লু, ফলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আর এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।’

বস্তুত, এই দেরি ছিল সপ্তাহ দুয়েক মাত্র। বেরগামোতে এত যে মানুষ মারা যাচ্ছে আজও, তার কারণ একটা ফুটবল ম্যাচে গোপন ঘাতকের মতো রয়ে গিয়েছিল কিছু দর্শক, যারা নিজেরাও জানত না যে তারা আক্রান্ত হয়েছে করোনায়। ওই সময়টাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন ভেতরে-ভেতরে আরেকটা উহান তৈরি হয়ে চলেছিল। শুরুর দিকে, যেটা হয়, একটা বলির পাঁঠা খোঁজা হচ্ছিল। ভাইরাসটা সত্যি কোথা থেকে বা কে ছড়াল, এই সুলুকসন্ধানেই টিভি টক শোর বক্তারা আর পত্রিকাগুলো কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিয়েছিল। বাদুড় না, প্যাঙ্গোলিনই এর মূল, এই নিয়ে অনেক প্রবন্ধও ছাপা হলো। সঙ্গে নানা রকম ষড়যন্ত্র-তত্ত¡। জৈব মারণাস্ত্রের প্রয়োগ বা পরীক্ষা চলছে, এসব নিয়েও ব্যস্ত হলো অনেকে। উহান থেকে ঘুরে আসার পর কদোনো শহরে যিনি মারা গেলেন প্রথম, সেই বেচারা অনেক সহানুভূতি যেমন পেলেন সবার, আবার উনিই যে সাক্ষাৎ ভিলেন, বড় শিরোনামে ছাপা হলো সেই খবর। কদিন পরে দেখা গেল, উহান নয়, জার্মানি থেকে একজন আক্রান্ত হয়ে এসে ছড়িয়েছেন প্রথমে ইতালিতে। এসব কূটতর্কের অবসরে, মরণবীজ তত দিনে এক থেকে অসংখ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। লকডাউনের পরে, মিলান বিমানবন্দরের অনেক ফ্লাইট বন্ধ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু চীন থেকে বহু অভিবাসী ও ব্যবসায়ী টিকিট বদলে অন্য রুট হয়ে ঢুকে পড়েছিল ইতালিতে, এরা পরে একেকজন ভূমিকা নিয়েছে ক্লাস্টার বোমার মতো।
পত্রিকা মারফত আমরা সবাই প্রায় জানি, প্রতিদিন কত মরছে। সেসব পুনরুলে­খের দরকার নেই এ জন্য, এই লেখাটুকু শেষ করার সময় নিশ্চয় দ্রুত বদলে যাচ্ছে সেই সংখ্যা। হ্যাঁ, মরে যাওয়া প্রতিটা মানুষ একটা সংখ্যা মাত্র এখন। যদিও তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো আলাদা আলাদা গল্প হয়ে রয়ে যাচ্ছে তাদের প্রিয়জনদের কাছেই কেবল। যারা অন্তত শেষ বিদায়টুকু জানাতে পাচ্ছে না কবরের পাশে দাঁড়িয়ে, হাসপাতালে ভিডিও কলের ওপার থেকে চিরতরে ঝাপসা হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে একেকটা মুখ। এই দৃশ্য কখনো দেখেনি এখানে কেউ, যখন হাসপাতালের ওয়ার্ড, কেবিন, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ভরে গিয়ে দীর্ঘ বারান্দাগুলোতে সারি সারি মুমূর্ষু মানুষ। সেসব ছাড়িয়ে হাসপাতালের বাইরে ভরে উঠছে ছোট ছোট ক্যাম্প। সেখানেও সংকুলান যখন হচ্ছে না, ভাড়া করা হচ্ছে হোটেল, অডিটরিয়াম। আর দ্রুতই, ভরে উঠছে সেগুলো। ভরে উঠছে কোনো কোনো শহরের কবরখানা। ফলে মৃতদেহগুলো মিলিটারি ট্রাকে চলে যাচ্ছে অন্য কোনো শহরে। ডাক্তার আর নার্সদের মৃতের সংখ্যাও যখন বাড়তে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মনোবল ধরে রাখা সত্যি কঠিন। বাড়িতে না ফিরে একটানা চিকিৎসা দিয়ে চলা ডাক্তারদের ধৈর্যের বাঁধ বুঝি ভাঙতে চলেছে। লিভোর্নো হাসপাতালের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ভালেন্তিনা বাতিনি যেমন বলছেন, ‘করোনা মহামারির এই যুদ্ধের দিনগুলোয় আমাদের ‘বীর’ বলা বন্ধ করুন। আমাদেরকে ধন্যবাদ দেওয়া বন্ধ করুন। হাসপাতালের বাইরে আমাদের প্রশংসা সংবলিত প্লাকার্ড নিয়ে অবস্থানও বন্ধ করুন। আমরা কিন্তু ওই মানুষগুলোই, যাদের সারা বছর আক্রমণাত্মক সুরে কথা বলেন আপনারা। দ্রুত রোগী না দেখার সব দোষ যেন আমাদের।’
লকডাউনের ফলে যাঁরা ঘরবন্দী হয়ে আছেন, তাঁরা বিপর্যস্ত হচ্ছেন একটা দিন কোনোভাবে শুধু কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে নয়। ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা বাড়ছে তাঁদের। হাসপাতালে শোনা যাচ্ছে আর জায়গা নেই, আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে যদি থাকতে হয়, তখন এই যাত্রা সামলে নিতে পারব? যদি টিকে থাকি, কারাখানা চলবে তো? আবার বেকার হয়ে পড়ব কি না, সেসব।
বিপদের দিনে কান্ডারি হয়ে এখানে চীনা অনেক ডাক্তার এসেছেন। সঙ্গে করে আনা চিকিৎসা সরঞ্জামাদির বড় বড় বাক্সে তাঁরা লিখে এনেছেন রোমান দার্শনিক সেনেকার একটা উক্তি, ‘ডব ধৎব ধিাবং ড়ভ ঃযব ংধসব ংবধ, ষবধাবং ড়ভ ঃযব ংধসব ঃৎবব, ভষড়বিৎং ড়ভ ঃযব ংধসব মধৎফবহ.’ এই বার্তায় পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আর্তি যেন জ্বলজ্বলে হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর চেয়ে মৃত্যুযন্ত্রণাকেই হয়তো বেশি ভয় পায় মানুষ। মৃত্যু অবধারিত, শুধু কেউই অপঘাতে বা অসময়ে মরতে চায় না। আর সে জন্য একটা সর্বাত্মক যুদ্ধ চলছে। আরেকটা গণবিলুপ্তির শুরু, নাকি মাঝপথে আছি আমরা সবাই, আরও কিছুদিন না গেলে সত্যি অনুমান করা কঠিন। দুনিয়াজুড়ে এই মরণ অসুখের প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টার দিকে উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে সবাই। তার আগে, বিপদ প্রতিদিনই ঘনিয়ে আসছে তার নানা চেহারা নিয়ে।
ইতালির বুদেলি­র একটা দ্বীপে ৩০ বছর ধরে একা থাকেন মাউরো মোরান্দি নামের এক খ্যাপাটে বৃদ্ধ। মাঝেমধ্যে মূল ভূখণ্ডে বেড়াতে আসেন। দ্রুতই ফিরে যান তাঁর মোহ–জাগানিয়া একাকিত্বে। মানুষের সঙ্গ তাঁর ভালো লাগে না একেবারেই। প্রকৃতির মধ্যে, আরেকটা প্রকৃতি হয়ে মিশে থাকেন। কথা বলেন গাছপালা, সামুদ্রিক মাছ আর পাথরগুলোর সঙ্গে। তাঁর কাছে প্রতিটা দিন লকডাউনের মতো মনে হতে পারে, কারও কারও কাছে আসলে উনি বিচিত্র এক আনন্দ বেদনায় নিমজ্জিত থাকেন। সভ্যতা, ঐশ্বর্য ও মানুষই যে সবকিছু নয়, মোরান্দি সেই কথা দূর থেকে মনে করিয়ে দিতে চান আমাদের।
মজনু শাহ: কবি। ব্রেসা, ইতালি
  •