রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কৃষি ও কৃষকের সংকট



নিজামুল হক লস্কর ::
কৃষি গ্রামবাংলার মানুষের আদি ও প্রধানতম পেশা। বোরই মুখ্য ফসল। কৃষি ও কৃষকের পেশাগত চরিত্র আমূল পাল্টে গেছে বিগত ২০/৩০ বছরে। কৃষিকাজে যন্ত্রপাতির ব্যবহারে ব্যাপক প্রসার কৃষির আধুনিকায়নের সাথে চারিত্রিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখছে।বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্হার উন্নতির ফলে পেশায় এসেছে বৈচিত্র্যতা ও বহুমুখিতা।পরিবহন সেক্টর,ছোট-খাট নানাবিধ ব্যবসা ও গার্মেন্টস শিল্পে গ্রামবাংলার বহু কৃষি শ্রমিক নিয়োজিত হওয়ায় কৃষিকাজে শ্রমিকের চরম সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি এখন আর লাভজনক পেশা নয়।উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমুল্য না পাওয়া,কৃষিপণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ও যথাযথ ব্যবস্হা না থাকা, ফসলের বাজারজাতকরনে চরম দূর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগিদের দৌরাত্ব্য কৃষিতে এক ধরনের অদৃশ্যমান অচলায়তনের সৃষ্টি করছে ক্রমশঃ। বাপদাদার পেশার উত্তরসূরী হিসাবে কৃষিই যাদের একমাত্র অবলম্বন ও অন্যকোন পেশায় যাবার মত যাদের সুযোগ সুবিধা কিংবা দক্ষতা-যোগ্যতা নেই তারাই অনেকটা নিরূপায় হয়ে ‘ঠেকায়’ পড়ে জোতদার-ভূস্বামীদের কয়েক বিঘা জমি বর্গা করে।তাই গ্রামে গ্রামে ২০-৩০ বছর পুর্বেও দশ-পনের পরিবার জোতদার -ভূস্বামীগন নিজেরা কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ করতেন ; এখন আর সেটা নেই।ছোট ছোট ভূমিহীন কৃষক ৫-১০-১৫ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ফসল উৎপাদন করে বটে কিন্তু উৎপাদনের খরচ দিতে গিয়ে ঋণগ্রস্হ হয়ে ফসলের যথোপযুক্ত মূল্য না পেয়ে বছরের পর বছর ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে। এতে করে কৃষিতে পুঁজি বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় আমার জানামতে হবিগন্জ জেলার হাওরঅন্চলে বহু জমি এবছরও অনাবাদী রয়ে গেছে। খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় মোট চাষযোগ্য জমির মধ্যে গত মৌসুমে ২লাখ ১৫হাজার ৩৬ হেক্টর জমি অনাবাদী রয়ে গেছে(প্রথম আলো,২৫ জুন,২০১৯)।কৃষি পেশায় এহেন অলাভজনক অবস্হা বিরাজমান থাকলে কৃষিশ্রমিক অন্যপেশায় তার জীবন-জীবিকার অবলম্বন খুঁজে বেড়াবেন, এটাই বাস্তবতা এবং তাই হচ্ছে দিন দিন।
তবে আশার প্রদীপ দেখতে পাই,বর্তমান সরকার বিশেষত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষক বান্ধব একজন জননেত্রী।কৃষি সংশ্লিষ্ট বিদগ্ধজন কৃষিতে তৃনমূল পর্যায়ে এহেন সংকট থেকে উত্তরনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি
সেচ,বীজ,কীটনাশক,কৃষিঋণ এবং কৃষিযন্ত্রপাতির বাজার ব্যবস্হাপনা সুলভ ও সহজিকরনের বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করবেন, এটা সময়ের দাবি।
বৈশাখ মাস এলেই সরকার পক্ষ থেকে ধানের ক্রয়মুল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় বটে,কিন্তু উৎপাদিত ফসলের অতি নগন্য পরিমান সরকার পক্ষে ক্রয় করা হয়,তাছাড়া সরকারী ক্রয়- ব্যবস্হাপনা নিয়েও কৃষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ রয়েছে।দূর্নীতি ও দলবাজি থেকে মুক্ত ব্যবস্হার সৃষ্টি করতে হবে। এ বছর সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান কিনবে,যা মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২কোটি ৪লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে মাত্র ২.৯৪ শতাংশ হয়(বাংলাদেশ প্রতিদিন,২১এপ্রিল,২০২০)।অথচ আমাদের পাশের রাজ্য পস্চিমবঙ্গ সরকার ২২ শতাংশ কৃষকের কাছ থেকে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই কৃষির সার্বিক উন্নয়নের জন্য বাজেটে বরাদ্দের পরিমান বৃদ্ধি সহ কৃষক যাতে ফসলের ন্যায্যমুল্য পায় তজ্জন্য যথাযথ ব্যবস্হা গ্রহন করা আবশ্যক।
অভূতপূর্ব ভয়াবহ করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসছে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।সুপারপাওয়ার থেকে শুরু করে সকল দেশই খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাপী বুভুক্ষ মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে।বিশ্ব মোড়লদের যদি একটি হুস হয় এ করোনা ভাইরাসের যাঁতাকলে পড়ে যে এয়ারক্র্যাফট, মিশাইল,এটমবোম,ড্রোন,সাবমেরিন খেয়ে পেট ভরবেনা,তাহলে এটা হবে করোনার বিশাল ইতিবাচক দিক।
১৭কোটি জনসংখ্যার আমাদের এই দেশে করোনা-উত্তর খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৃষি ও কৃষকের সমস্যা নিরসনে সবচেয়ে অগ্রাধিকার খাত গন্যে আগামী বাজেটে সর্বোচ্চ প্রণোদনার ব্যবস্হা রাখার পাশাপাশি কৃষককে তার উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে; নুতবা কৃষক আর কষক থাকতে চাইবেনা,সে অন্য পেশা খুঁজে নিবে এবং ফলস্বরূপ চাষযোগ্য জমি অনাবাদী জমিতে রূপান্তরিত হবে ক্রমশঃ।তাই দূর্ভীক্ক, মঙ্গা রোধে কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে হবে।

  •