রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নান্দনিক সিলেট : পর্যটনের উন্মুক্ত আধার



মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার:
নিখিলের এত শোভা, এত রূপ, এত হাসি-গান,
ছাড়িয়া মরিতে মোর কভূ নাহি চাহে মনপ্রাণ।
সৌন্দর্য পিয়াসি কবির কণ্ঠঝরা এই আকুতির মনোহর লীলাভূমি বাংলাদেশ। এই সুন্দর চির সবুজ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত সিলেট বিভাগ। এখানে যেমন ছড়িয়ে আছে প্রাচীন নিদর্শন; তেমনি থরে থরে সাজানো পাহাড়, জনপদ, নদী-নালা, হাওর-বিল, মাঠ-ঘাট। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা অপরূপ ছবি। চোখ ধাধানো রূপ মাধুর্যের স্বার্থক প্রতিচ্ছবি শ্রীভূমি সিলেট। এখানে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক ভূমি ও জনপদের নিদর্শন তেমনি সবুজ গালিচাসম চা বাগানের অলঙ্করন; গাছ-গাছালির ¯িœগ্ধ ছায়া; শাল, সেগুন আর রাবার বাগানের সমারোহে বুনো পাখির কাকলী; মিনি সাগর খ্যাত হাওর ভরা স্বাদু পানির মৎস ও অতিথি পাখির কলতান। পাথুরে রাজ্য জাফলং-এর মনোলোভা সুষমা বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় সেরা। ভূগর্ভস্থ খনিজ ভাÐার, পাহাড়ের পরতে পরতে সাজানো পাথর, বালি আর কয়লার অফুরান মওজুদ সমৃদ্ধ করেছে সিলেটকে। ওলি-আউলিয়ার পদধূলি আর তাঁদের মুখনিঃসৃত শান্তির বাণী বিতরণে এ অঞ্চল পরিণত হয়েছে পুণ্যভূমিতে।
সিলেটের মোট ৪টি জেলার সবক’টিতেই রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। প্রতিদিন হাজার দর্শকের পদধ্বনিতে মুখরিত হয় এ অঞ্চল। তন্মধ্যে ধর্মকেন্দ্রীক গুরুত্বপূর্ণ স্থান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমÐিত স্থান। ভ্রমণপ্রিয় মানুষের কাছে তাই সিলেট খুবই আকর্ষণীয়। সম্প্রতি যাতায়াত এবং আবাসিক সুবিধা বৃদ্ধির ফলে সিলেটের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ আরো বেড়েছে। জেলাওয়ারি সিলেট বিভাগের দর্শনীয় স্থানসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নি¤œরূপ:
সিলেট জেলা : সিলেট বিভাগে মোট ৪টি জেলার মধ্যে সদর সিলেট জেলার মোট আয়তন ৩৪৫২ বর্গ কি.মি. এবং জনসংখ্যা ৩৫,৬৭,১৩৮ জন। এর উত্তরে ভারতের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, পূর্বে ভারতের কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা। মোট ১৩টি উপজেলা সমৃদ্ধ এ জেলাকে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলা হয়। উঁচু পাহাড়ি ভূমির পাশাপাশি অসংখ্য নদনদী, খালবিল, চা বাগান ও নান্দনিক প্রাকৃতিক শোভা এ জেলার প্রধান বৈশিষ্ট। জেলার প্রধান নদী হলো সুরমা ও কুশিয়ারা।
এখানে অনেকগুলো সমাধি ক্ষেত্র রয়েছে। তন্মধ্যে হজরত শাহজালাল র.-এর মাজার, হজরত শাহপরাণ র.-এর মাজারসহ বহু মাজার রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা মহাপ্রভূ জিওর আখড়া, দশনামী আখড়া, ব্রহ্ম মন্দির, চৈতন্যদেবের মন্দির (ঢাকা দক্ষিণ), বাসুদেব মন্দির উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে আলী আমজদের ঘড়ি, ক্বিন ব্রিজ, রাজা গৌড়গোবিন্দের দুর্গ, জৈন্তা রাজবাড়ি, মণিপুর রাজবাড়ি, চাাঁদনী ঘাট, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, উল্লেখযোগ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এলাকা হচ্ছে মালনিছড়া চা বাগান, লাখাতুয়া চা বাগান, জাফলং ও তামাবিলের নিসর্গশোভা, ভোলাগঞ্জ পাথর কেয়ারি প্রভৃতি। বিনোদনের জন্য রয়েছে ড্রিমল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, ওসমানী শিশুপার্ক, ওসমানী জাদুঘর, মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘর, মিউজিয়াম অব রাজা’স, অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, মনিপুরী মিউজিয়াম প্রভৃতি।
মৌলভীবাজার জেলা : ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার জেলার আয়তন ২,৭৯৯ বর্গ কি.মি. এবং জনসংখ্যা ১৯,৯৪,২৫০ জন। উত্তরে সিলেট জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা বেষ্টিত এ জেলায় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকি অবস্থিত। এর প্রধান নদী হচ্ছে মনু, ধলাই, জুড়ি ইত্যাদি।
জেলার প্রধান আকর্ষণ হলো দেশের একমাত্র বৃহৎ জলপ্রপাত মাধবকুÐ। এর কাছাকাছি রয়েছে একটি প্রাচীন শিব মন্দির। মাধবকুÐে একটি ইকোপার্কও রয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হামহাম জলপ্রপাত ও মাধবপুর লেক। নিসর্গ ও জীববৈচিত্রময় এ বনাঞ্চলে রয়েছে ৪০৭ প্রজাতির প্রাণী ও ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ। শহরে রয়েছে হজরত শাহ মোস্তফা র.-এর মাজার। রয়েছে বর্ষিজুরা ইকোপার্ক, মনু ব্যারেজ লেক। ৪ কি.মি. দূরত্বে রয়েছে খোঁজা মসজিদ ও বিবির মোকাম।
বাাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি ও অতিথি পাখির অভয়াশ্রম হাইল হাওর এ জেলার অপরূপ প্রাকৃতিক লীলানিকেতন। চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল এ জেলায় অবস্থিত। এখানে রয়েছে ছোটবড় ৯২টি চা বাগান। এখানে প্রতিষ্ঠিত চা জাদুঘর দেশের চা শিল্পের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। রয়েছে রাবার বাগান, আগর বাগানেরও প্রাচর্য। আদিবাসী খাসিয়া ও মণিপুরীদের জনজীবন, তাদের সংস্কৃতির লালন ও বিকাশ ধারায় রয়েছে চমকপ্রদ বৈচিত্র।
সুনামগঞ্জ জেলা : সম্পূর্ণরূপেই হাওরনির্ভর জেলার নাম সুনামগঞ্জ। ধানের দেশ ও মাছের দেশ হিসেবে খ্যাত এ জেলার আয়তন ৩৭৪৭ বর্গ কি.মি. এবং জনসংখ্যা ২৫,৬৪,৫৪০ জন। এর উত্তরে ভারতের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়, দক্ষিণে হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা এবং পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলা। ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার প্রধান নদী সুরমা। কুশিয়ারা নদী জেলার দক্ষিণ সীমানা দিয়ে পূর্ব দিক হতে পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে সুরমা নদীতে মিশেছে।
বেশ কিছু অপরূপ সুন্দর হাওর রয়েছে সুনামগঞ্জে। এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর, করচার হাওর, দেখার হাওর প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। হাওরকেন্দ্রীক পর্যটন সুবিধা সম্পন্ন এ জেলার সবচাইতে গৌরবের ধন টাঙ্গুয়ার হাওর। কথিত আছে, ‘ছয় কুড়ি কান্দা আর নয় কুড়ি বিল’ নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য হিসেবেও পরিচিত। প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ এ হাওরে হিজল-করচের দৃষ্টি নন্দন সারি ছাড়াও রয়েছে দু’শ প্রজাতির গাছ-গাছালী, বিশাল মৎস্য ভাÐার ও অগণিত পাখির অবাদ বিচরণ।
ভাটি এলাকায় জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ নৌকা, মাছ শিকার ও লোকগান। এসবই ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের মনের খোরাক। লোকসঙ্গীতের অমর কবি হাসন রাজার বাড়ি, ৮ শতাধিক বছরের প্রাচীন লাউরের রাজবাড়ি, ৫ শতাধিক বছরের প্রাচীন গৌরারং জমিদার বাড়ি, সুখাইয়ের জমিদার বাড়ি, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের বসতভিটা, রাধরমন দত্তের সমাধি, শাহ আরেফিনের মাজার প্রভৃতি এ জেলার ঐতিহ্যের সাক্ষী।
হবিগঞ্জ জেলা : ভূ-প্রকৃতির দিক থেকে বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ হবিগঞ্জ। নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার আয়তন ২৬৩৬ বর্গ কি.মি. এবং জনসংখ্যা ২১,৭১,০৬৪ জন। উত্তরে সুনামগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, পূর্বে মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলা, পশ্চিমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ জেলাবেষ্টিত এ জেলায় যেমন রয়েছে টারিশিয়ারি যুগের পাহাড়ি ভূমি তেমনি বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি ও নিচু হাওরাঞ্চল। এর প্রধান নদনদী হচ্ছে কালনী, কুশিয়ারা, খোয়াই, করাঙ্গী, বরাক।
এখানে রয়েছে সুলতানি আমলের শংকরপাশা শাহী মসজিদ, হবিব খাঁর রাজবাড়ি, সুলতানশী হাবেলি, বৈষ্ণবধর্ম জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক জগন্মোহন গোসাইর বাড়ি, বিথঙ্গলের আখড়া, সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরউদ্দিন র.সহ বারো আউলিয়ার মাজার, শ্রীচৈতণ্যের মাতুলালয়, লোক কবি শেখ ভানুর মাজার প্রভৃতি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
ব্রিটিশ ভারতীয় রাজনীতির তিন দিকপালের অন্যতম বাগ্মীনেতা বিপিন পালের জন্মস্থান হবিগঞ্জের পৈল গ্রামে। মহান মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনাকেন্দ্র ও মুক্তিবাহিনীর প্রথম সদর দপ্তর ছিল মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে। মুক্তিবাহিনীর উপ সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল এম এ রব-এর জন্মস্থান ও তাঁর সমাধিক্ষেত্র রয়েছে এখানে। রয়েছে পাক বর্বর বাহিনীর নির্মমতার স্বাক্ষী ফয়জাবাদ বধ্যভূমি।
চা বাগানের মনোরম শোভাময় হবিগঞ্জ বাংলাদেশের গর্ব। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একে বেকে বয়ে চলা তেলিয়াপাড়া থেকে চুনারুঘাট পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে বিস্তৃত সবুজ গালিচার ন্যায় বিস্তৃত চা বাগানের অপরূপ দৃশ্য পথিকের দৃষ্টি কাড়ে। চা বাগান বেষ্টিত ও প্রাণবৈচিত্রে ভরপুর সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রয়েছে ১৯৭ প্রজাতির জীব-জন্তু ও ২০০ প্রজাতির পাখি। রেমা কালেঙ্গা অভয়ারণ্য পর্যটকদের আর একটি আকর্ষণীয় বন। এখানে রয়েছে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ। বিরল প্রজাতির পাখির জন্য এই বন অত্যন্ত সুপরিচিত। উপমহাদেশের বৃহৎ গ্রাম বানিয়াচং-এর নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং সাগরদিঘি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। শাহজিবাজার রাবার বাগান ও শাহজিবাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সংলগ্ন নিসর্গশোভা অতুলনীয়। এছাড়া হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র এবং হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডের ফ্রুটস ভ্যালি প্রভৃতি এ জেলার অপরূপ দর্শনীয় স্থান।

  •