শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

প্রসঙ্গ : করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ



কাজী তোফায়েল আহমদ::

কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের পৃথিবীব্যপী যজ্ঞের প্রায় পাঁচ মাস হলো। অদৃশ্য এই মহাশক্তির তান্ডবে কপোকাত বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলো। পৃথিবীর ৪০ লক্ষ মানুষ আজ আক্রান্ত। ২ লক্ষ ৭৭ হাজার লোকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ক্ষুদ্র ভাইরাসটি। বৈশ্বিক বিশ্বায়নের যুগে এই মহামারি। শুধু দেশে দেশে নয়, কার্যত পৃথিবীর ৭ শত কোটি মানুষে মানুষে সামাজিক বা শারীরিক বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের অর্থনীতির চাকা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। মরণপণ চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি দুনিয়ার বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা। করোনা ভাইরাসের কাছে সবাই অসহায়!
তবুও মানুষের কাছে তার জীবন সবচেয়ে প্রিয়। করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকতে পৃথিবীর নানা প্রান্তর মানুষ নানা ধরনের ঔষধ এবং পথ্য আবিষ্কার করেছে। যদিও এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে মানুষের বিশ্বাস এবং লক্ষণ বিবেচনায় প্রায়োগিক সাফল্য থাকতে পারে। এখানে এরকম কিছু উপস্থাপন করা হলো। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মতে, কোভিড-১৯ একটি সংক্রামক রোগ যেটি নতুন একটি করোনা ভাইরাসের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানুষকে আক্রমণ করেছে। আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় বা কথা বলার সময় তার মুখ থেকে যে ক্ষুদ্র পানিকণা বের হয়ে আসে তার মাধ্যমে কোভিড-১৯ একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এই কণাগুলো কাছে থাকা যে-কোনো মানুষ তার নাক বা মুখ দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। তবে কণাগুলো খুব ভারী হওয়ার কারণে বাতাসে খুব বেশি দূর যেতে পারে না। ৩ ফুট দূর যাওয়ার পর মাটিতে পড়ে যায়। এ কারণেই আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছে যাওয়ার কারণে একজন থেকে আরেকজন সহজেই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হতে পারে। এই ভাইরাস খুবই ছোঁয়াচে। মাটি বা অন্য কোনো স্তরে ভাইরাসটি কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে সেটির নির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায় নি। তাই সবকিছু সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির আশপাশের সবকিছু পরিস্কার রাখতে হবে।
যেহেতু হাত দিয়ে আমরা সব কিছু ধরি, ফলে হাতই সবার আগে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসতে পারে। এই কারণে হাত দিয়ে মুখ নাক ও চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যাতে কোনো কারণে ভাইরাস হাতে লেগে গেলেও তা যেন শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। হাঁচি ও কাশি দেয়ার সময় কুনুই ভাঁজ করে হাঁচি দিতে হবে। অথবা টিস্যু মুখে দিয়ে টিস্যুর মধ্যে হাচি দিতে হবে। এবং ব্যবহৃত টিস্যুটি ঢাকনাযুক্ত পাত্রে ফেলতে হবে।।
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে অ্যালকোহল আছে এমন কোনো হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে অথবা সাবান পানি দিয়ে বার বার হাত পরিষ্কার করে নেওয়া। এটা করলে হাতে থাকা ভাইরাস সহজেই অকার্যকর হয়ে যাবে।
চা পান করা :
চা পানের উপকারিতা নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত গবেষণা উপস্থাপন করেছিলেন চীনের জনপ্রিয় ডাক্তার লি ওয়েনল্যং। যিনি করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সত্য বলার জন্য চীনের কমিউনিস্ট সরকারের কাছ থেকে শাস্তি পেয়েছিলেন এবং পরে একই রোগের কারণে মারা গিয়েছিলেন তিনি ।
গবেষণার উদ্দেশ্যে করোনা রোগীদের কেইস ফাইলগুলো নথিভুক্ত করে তিনি একটি নিরাময়ের প্রস্তাব করেছিলেন। যা কোভিড-১৯ এর প্রভাবকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।
কোভিড-১৯ মানবদেহে সংক্রমণকারী ভাইরাস। রাসায়নিক * মেথাইলেক্সানথাইন * থিওব্রোমাইন * এবং * থিওফিলিন * এমন এক যৌগিক মিশ্রণ যা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জাগিয়ে তুলে।
এই জটিল শব্দগুলো চীনের নাগরিকদের বোঝা সহজ ছিল না। কিন্তু তারা যা বুঝে, সেটা হলো “চাই”। বাংলাদেশ-ভারতে যা চা। আমাদের রেগুলার চা-এর মধ্যে এই রাসায়নিকগুলোই রয়েছে।
চায়ের প্রধান উপাদান মেথাইলেক্সানথাইন উত্তেজক ক্যাফেইন। চায়ের মধ্যে পাওয়া মেথাইলেক্সানথাইন ছাড়াও অন্য দুটি রাসায়নিক থিওব্রোমাইন এবং থিওফিলিনেরও যৌগিক মিশ্রণ রয়েছে।
চা-গাছ পোকামাকড় এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক প্রাণী থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় হিসাবে এই রাসায়নিকগুলো তৈরি করে।
কে জানত যে, এই ভাইরাসকে প্রতিরোধের সমস্ত সমাধান এক কাপ সাধারণ চায়ের মধ্যেই হবে? এবং এ কারণেই চীনে অনেক রোগী নিরাময় হয়। চীনের হাসপাতাল কর্মীরা দিনে তিন বার রোগীদের চা সরবরাহ করেন। এবং এর পরিণতি-শেষ পর্যন্ত উহান করোনামুক্ত হয়েছে।
তবে আমরা চীনের সেই তরুণ ডাক্তার খর ডবহষরধহম-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পারি। যিনি কর্তৃপক্ষকে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু দিয়ে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, এটি একটি মহামারি! তার মৃত্যুর পর উহানের মানুষ প্রতিবাদের প্রতিক হিসেবে একটি কার্টুন প্রচার করেছিল।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। পাশাপাশি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেওয়া স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশাবলি সঠিকভাবে পালন করা।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধের প্রথম ধাপ হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা গড়ে তোলা এবং প্রত্যেকের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ ইমিউন সিস্টেম বাড়িয়ে তোলা। এর ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে মারাত্মক ল²ণ অর্থাৎ শ্বাসযন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ, সেগুলো সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সহজভাবে বললে, যেকোনো ভাইরাস হলো প্রোটিন যুক্ত অণুজীব, যার কারণে মানুষ জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট এমনকি মারাত্মক নিউমোনিয়া (নতুনভাবে) হতে পারে। তা ছাড়া এই ভাইরাস ভয়ংকর প্রাণঘাতী রোগ তৈরি করতে পারে খুব সহজে। তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বেশি পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে প্রতিদিন।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হলো কিছু ভিটামিন, মিনারেল ও এনজাইম, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিক্যালের (দেহের কোষ, প্রোটিন ও ডিএনএ’র ক্ষতি করে এমন কিছু) বিরুদ্ধে লড়াই করে, শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়ে শরীরে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। প্রধান অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলো হলো বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, সি, ই, লাইকোপেন, লুটেইন সেলেনিয়াম ইত্যাদি।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ যে খাবারগুলো বেশি করে খেতে হবে, সেগুলো হলো :
বিটা ক্যারোটিন : উজ্জ্বল রংয়ের ফল, সবজি। যেমন গাজর, পালং শাক, আম, ডাল ইত্যাদি।
ভিটামিন এ: গাজর, পালং শাক, মিষ্টি আলু, মিষ্টিকুমড়া, জাম্বুরা, ডিম, কলিজা, দুধজাতীয় খাবার।
ভিটামিন ই : কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, পেস্তাবাদাম, বাদাম তেল, বিচিজাতীয় ও ভেজিটেবল অয়েল, জলপাইয়ের আচার, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি।
ভিটামিন সি : আমলকী, লেবু, কমলা, সবুজ মরিচ, করলা ইত্যাদি।
এছাড়া যে খাবার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো। এ খাবারগুলো আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে তো বাড়িয়ে তুলবেই, সেই সঙ্গে আরও বিভিন্নভাবে আপনার শরীরকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করবে।
সামগ্রিকভাবে উদ্ভিজ্জ খাবারই হলো অ্যান্টি-ক্সিডেন্টের সবচেয়ে ভালো উৎস, বিশেষ করে বেগুনি, নীল, কমলা ও হলুদ রংয়ের শাকসবজি ও ফল। এ ছাড়া যে ধরনের খাবারগুলো আপনার প্রয়োজন, সেগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো।
১. সবজি: করলা (বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ), পারপেল/লাল পাতা কপি, বিট, ব্রোকলি, গাজর, টমেটো, মিষ্টি আলু, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি।
২. শাক : যেকোনো ধরনের ও রঙের শাক।
৩. ফল : কমলালেবু, পেঁপে, আঙুর, আম, কিউই, আনার, তরমুজ, বেরি, জলপাই, আনারস ইত্যাদি।
৪. মসলা: আদা, রসুন, হলুদ, দারুচিনি, গোলমরিচ।
৫. অন্যান্য: শিম বিচি, মটরশুঁটি, বিচিজাতীয় খাবার, বার্লি, ওটস, লাল চাল ও আটা, বাদাম।
৬. টক দই: এটি প্রোবায়োটিকস, যা শ্বাসযন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্র সংক্রমণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, বাদামজাতীয় খাবার শরীরে নিউটোভ্যাক্স ভ্যাকসিনের অ্যান্টিবডি প্রক্রিয়াকে উন্নত করে, যা স্টেপটোকোক্কাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
৭. চা: গ্রিন টি, লাল চায়ে এল-থেনিন এবং ইজিসিজি নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা আমাদের শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনেক যৌগ তৈরি করে শরীরে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
৮. এ ছাড়া ভিটামিন বি-৬, জিংক জাতীয় খাবার (বিচিজাতীয়, বাদাম, সামুদ্রিক খাবার, দুধ ইত্যাদি) শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির কোষ বৃদ্ধি করে। তাই এ ধরনের খাবার বেশি খেতে হবে।
৯. উচ্চ মানের আমিষজাতীয় খাবার (ডিম, মুরগির মাংস ইত্যাদি) বেশি করে খেতে হবে।
১০. অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের খুব ভালো কাজ পেতে হলে খাবার রান্নার সময় অতিরিক্ত তাপে বা দীর্ঘ সময় রান্না না করে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় রান্না করতে হবে।
ওপরের খাবারগুলো ছাড়াও নিউমোনিয়া প্রতিরোধে উচ্চ আমিষযুক্ত খাবার বেশি করে খেতে হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ও টিস্যু দ্রæত সুস্থ হয়ে উঠবে এবং পাশাপাশি নতুন টিস্যু তৈরি হবে। এর সঙ্গে দরকার পর্যাপ্ত ঘুম। অপর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম শরীরে কর্টিসল হরমোনের চাপ বাড়িয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে।
যে খাবার বাদ দিতে হবে :
সব ধরনের কার্বনেটেড ড্রিংকস, বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, তামাক, সাদাপাতা, খয়ের ইত্যাদি। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় বাধা দিয়ে ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়, ঠান্ডা খাবার, আইসক্রিম, চিনি ও চিনির তৈরি খাবার (যা ভাইরাসের সংক্রমণে সহায়তা করে)।
এ লেখার উদ্দেশ্য সঠিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে প্রত্যেকের শরীরে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করতে সহায়তা করা, যাতে শুধু করোনাভাইরাস নয়, সব ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় আপনি শারীরিকভাবে সক্ষম থাকতে পারেন।
বাংলাদেশে করোনা বেশি সংক্রামক হবে না বলে অনেকে মনে করেন । তাদের ধারনা এই সংক্রামকটি ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় দেরিতে আক্রমণ করায় শক্তি হ্রাস পেয়েছে।
আবার এদেশে বয়স্ক (৭০) ঊর্ধ্ব জনগোষ্ঠী কম। উস্ম (হিউমিড) আবাহওয়া, বিসিজি টিকা বা য²ার টিকা প্রতিষেধক থাকায় করোনার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটতে পারেনি। তাছাড়া মশার কামরেও শরীরে কিছুটা মেলেরিয়া এনটিবডি তৈরি হয় বলে সহজে কাবু করতে পারে না। এদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিকতা এবং রৌদ্র থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন ডি শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরিতে সহায়তা করেছে।

  •