মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সিলেটি নাগরীলিপির নবজাগরণ



মোস্তফা সেলিম ::
প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ রাজ্য, হরিকেল রাজ্য হয়ে যে প্রাচীন শ্রীহট্ট : সেখানেই ভাষালিপির এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে চতুর্দশ শতকে। পৃথিবীতে প্রচলিত কয়েক হাজার ভাষার যেখানে নিজস্ব লিপিই নেই, সেখানে একটি ভাষার একাধিক লিপির যে প্রবর্তন বাংলাদেশের সিলেটে হয় ; ভাষা-লিপির ইতিহাসে এটি এক বিরল অধ্যায়। বাংলালিপির পাশাপাশি সিলেটি নাগরীলিপি পাঁচ শ বছর দাপটের সঙ্গে টিকে ছিল বঙ্গের উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে।
এ লিপির সাহিত্যভান্ডার নেহায়েত ছোট নয়। নাগরীলিপিতে লিখেছেন সৈয়দ শাহনূর, দীন ভবানন্দ, আরকুম শাহ, শিতালং ফকির, মমিন উদ্দিন দৈখুরা, শেখ বানু সহ বেশ কয়েকজন মরমি গীতিকবি। তাঁদের গান বাংলার মরমি গানের ভূবনে অবিনশ্বর। এরা সকলেই লিখেছেন সিলেটি নাগরীলিপিতে, বাংলা লিপিতে নয়।
বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে সমাজ বাস্তবতার অনিবার্য প্রয়োজনে সিলেটি নাগরীলিপি, ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব বিকাশ বিস্তৃতি। প্রায় পাঁচ শ বছর ধরে এই লিপি চর্চার ভেতর দিয়ে আমাদের ভূগোলের একটি বিরাট অংশে যে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও সৃজনচর্চা চলেছে-এটি আমাদের ঐতিহ্যের এক অক্ষয় সম্পদ। কালের অমোঘ নিয়মে ব্যবহারিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় অর্ধ শতাব্দী যাবৎ নাগরীলিপি প্রায় লুপ্ত। আমি প্রায় এক যুগ যাবত বিস্মৃতির অণলান্ত থেকে নাগরীলিপির ইতিহাস ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে সংগ্রহ, গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ করে যাচ্ছি। এখানে তারই খানিক আত্মপুরাণ উপস্থাপিত হলো।

আমার জীবনটা এক অসফল মানুষের গল্প। তেমন কিছুই হলো না এই জীবনে। না নিজের জন্য, না দেশের জন্য; না সমাজের জন্য। কেবলই ব্যর্থতা। এর মাঝেও জীবনের সঞ্চয়ের হিসেবে বসি, কড়িগুনে যোগবিয়োগ করে দেখি, কিছু না হোক একটা কাজে তো খানিকটা সফল হয়েছি। এই নিরর্থক জীবনে এটাই এখন সবচেয়ে বড় সান্ত¡না, বড় আনন্দের উপলক্ষ।
কয়েক বছর থেকেই লেগে আছি সিলেটি নাগরীলিপির ঐতিহ্য গৌরব পুনরুজ্জীবনের কাজে। প্রায় দশ/বারো বছরের বিরতিহীন কাজের ফল, জেগে ওঠেছে সিলেটি নাগরী। বিলুপ্ত ঐ অধ্যায় এখন আমাদের ভাষা-লিপির ইতিহাসে ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত সকল মহলে। সস্প্রতি সিলেট শহরের প্রবেশমুখ কিনব্রিজের সামনে সুরমা পয়েন্টে নির্মিত হয়েছে ‘নাগরী চত্বর’। বাস্তবায়ন করেছে সিলেট জেলা পরিষদ। চতুর্দশ শতাব্দে নাগরীলিপি চালু হয় সিলেটে। বাঙলালিপি থাকার পরও উদ্ভাবকেরা এর প্রবর্তনায় আগ্রহী হয়েছিলেন বাস্তব প্রয়োজনে। জটিল বাংলা লিপির বেড়াজাল থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় তারা সংক্ষিপ্ত এবং ধ্বনি বিজ্ঞানসম্মত একটি বর্ণমালা প্রচলন করে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে সমর্থ হয়েছিলেন। এই লিপিতে সিলেট সংলগ্ন এলাকায় প্রায় পাঁচশত বছর চলে জীবনের পাঠ। দৈনন্দিন জীবনে যেমন ছিল মানুষের সঙ্গী, তেমনি সাহিত্যসাধনায় পেয়েছিল মানুষের সহযোগ। শত শত গ্রন্থ, মরমি গান রচনা হয়েছে এ লিপিতে। সৈয়দ শাহনূর, শীতালং ফকির থেকে আরকুম শাহ কত মহাজন লিখেছেন তাঁদের চিন্তাজাত রচনা। এই জীবনসংশ্লিষ্ট লিপি বিগত শতকে হারিয়ে যায় আমাদের জনজীবন থেকে। এর কারণ এবং প্রেক্ষিত বেশ বড়। সিলেটের মানুষের গৌরব, বাঙালির গৌরব; বাংলা ভাষা সংস্কৃতিরই এক মহিমাময় এই লুপ্ত অধ্যায় ফিরিয়ে আনার কঠিন চ্যলেঞ্জ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম ২০০৯ সালে। লক্ষ্য ছিল একটাই নাগরীলিপির পুনরুজ্জীবন। বুকে সাহসের ভিত ছিল ঐতিহ্যবান সিলেটিদের সমর্থন। এর আগে এই অক্ষমজনের প্রচেষ্টায় সিলেটের ইতিহাসের প্রাচীন গ্রন্থগুলো জীবন পেয়েছে।
২০০৯ সালে শুরু হয় নাগরীলিপির নতুন প্রকাশনা। একের পর এক বের হয় নাগরীলিপিতে রচিত সাহিত্যের পুথি। ২০১৪ সালে বের হয় নাগরীলিপির ২৫টি পুথির একটি সম্ভার। অভাবিত সমর্থন পেয়েছি মানুষের। গত দশ বছরে দেশে বিদেশে নানা আয়োজনের মাধ্যমে ছিলাম তৎপর । দেশের প্রধান গণমাধ্যমসমূহও এসময় প্রকাশ করেছে নানা ফিচার। রেডিও টিভিতে নিয়মিতভাবেই এই বিষয়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনে ভূমিকা রেখেছি, কথা বলেছি। দেশে বিদেশে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। দেশে সভা সেমিনার আয়োজন, বিনামূল্যে স্কুল কলেজে বই বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছি। জনমত তৈরীর জন্য আমরা নির্মাণ করি তথ্যচিত্র ‘নাগরী লিপির নবযাত্রা’। এটি পরিচালনা করেন বন্ধু সারোয়ার তমিজউদ্দিন। এই তথ্যচিত্রের বহূ প্রদশনী করা হয় দেশে এবং বিদেশে। আমাদের এই প্রচার প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফেইসবুককেন্দ্রিক প্রচারণা শামিল হয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবার ফিরে এসেছে নাগরী। এবার ফিরেছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ঐতিহ্য হয়ে। একসময় যা ছিল মূর্ত, এখন অনেকটা নিথর হয়ে।
সিলেটসহ সারা দেশে, এমন কী বহির্বিশ্বেও বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকায় নাগরীলিপির পুনরাবর্তন হয়েছে। সিলেটের মানুষ হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরে পেয়ে আহলাদে আটখানা। তারা রাস্তায় বের হলেই যখন দেখেন ‘নাগরী চত্বর’, জেলা প্রশাসকের অফিসের দালানে নাগরীলিপির ম্যুরাল, নাগরী পাঠশালার সাইনবোর্ড, শাড়ির দোকান কিংবা বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নামটি ‘নাগরী’, শপিং ব্যাগের হরফ হচ্ছে নাগরী কিংবা কোনো স্যুভেনিরের প্রচ্ছদে শোভা পাচ্ছে নাগরী হরফ, তখন তো গর্ভে বুক ভরে ওঠাই স্বাভাবিক। বইয়ের দোকানে থরে থরে সাজানো নাগরীলিপির বই, বাংলা একাডেমির বইমেলায় কোনো প্রকাশের স্টলে নাগরীলিপিতে সাজসজ্জা কিংবা তাদের শপিং ব্যাগে নাগরীলিপিকে কোলাজ করে দৃষ্টিকাড়া ডিজাইন, তখন মনতো আনন্দে নেচে ওঠারই কথা। নয় কী? নাগরীলিপির নবজাগরণের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে আরো বেগবান হয়ে।

মোস্তফা সেলিম: গবেষক, লেখক।

  •