শনিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

‘আগর লাখান আর সিলেটে বেতর কাম কাজ নাই, আমরা বড় অভাবের মাঝে আছি’



সিলেট অফিস::
‘আগর লাখান আর সিলেটে বেতর কাম কাজ নাই, আমরা যারা বেত দিয়া বিভিন্ন জিনিসপত্র বানাই আমরা খুব অভাবের মাঝে আছি। কথাগুলো বলছিলেন শেখ ঘাট বেতর বাজারের শ্রমিক আব্দুল কাদির। করোনায় নিমজ্জিত যখন সারা বাংলাদেশ তার বাহিরেও নয় সিলেট। আর এই সংকটময় সময়ে তারা তাদের এই করুণ গল্প শোনালেন।
সরেজমিনের দেখা যায়, উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বাজারে প্ল¬াষ্টিক সামগ্রীর দাপটে বেতশিল্পের চাহিদা দিন-দিন কমে যাওয়ার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি। উপযুক্ত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ না থাকায় অন্য পেশায় তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারছে না। ফলে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বাহারি ও মন কাড়া রকমারি প্ল¬াস্টিক সামগ্রী বাজার দখল করার কারণে বেত ও বাঁশের তৈরি জিনিসের প্রতি মানুষ দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
সিলেটে বেত ও বাঁশশিল্পের সুনাম দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগের সাথে পাল¬া দিয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই দিনদিন বেত শিল্পের বিশ্বজোড়া খ্যাতি যশ ধীরে ধীরে মøান হয়ে অলাভজনক শিল্পে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে বেত শিল্পীরা বাপ-দাদার রেখে যাওয়া পেশা ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন নতুন পেশা। যে পেশায় তারা একেবারে আনাড়ি।
মাত্র কয়েক বছর আগেও সিলেটে বেত ও বাঁশশিল্পের ব্যবসা জমজমাট ছিল। কয়েক বছরের ব্যবধানে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বেত ও বাঁশশিল্প হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে। এ পেশার সাথে যুক্ত আছে সহস্রাধিক শ্রমিকেরও দুর্দিন চলছে।
২০ বছর প‚র্বে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-এর উদ্যোগে সিলেটে নগরীর ঘাসিটুলা এলাকায় একটি বেতশিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়। কিছুদিন পর সেটা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর অনেকেই ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এই শিল্পের প্রসারে ভ‚মিকা রাখেন।
সিলেট এক সময় বেতের জন্য বিখ্যাত ছিল। সিলেটে ১৮৮৫ সালে প্রথম বেতের ফার্নিচার ম্যানুফেকচার হয়। ১৯২৬ সাল পর্যন্ত সিলেটের বনাঞ্চলে প্রচুর বেত পাওয়া যেত। যদিও পরবর্তীতে সিলেটে অঞ্চলে বেতের উৎপাদন কমে আসতে থাকে। বর্তমানে উৎপাদিত বেতে চাহিদা প‚রণ না হওয়ায় বিদেশ থেকেও বেত আমদানি করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে দাম বেশি পড়ায় ব্যবসয়ীরা এই শিল্পে লোকসান দিচ্ছেন।
মাত্র কয়েক বছর আগেও সিলেটে বেত শিল্প ব্যবসা জমজমাট ছিল। কয়েক বছরের ব্যবধানে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প হুমকির মুখে দাঁড়িয়েছে। এ পেশার সাথে যুক্ত আছে সহস্রাধিক শ্রমিকেরও দুর্দিন চলছে।
এক সময় বাংলাদেশের বেতের আসবাপত্রের চাহিদার সিংহভাগ যোগান দিত সিলেটের বেত শিল্প। অভ্যন্তরিণ চাহিদা প‚রণ করে সিলেটের বেতের তৈরি সামগ্রী আমেরিকা, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হত। বর্তমানে তা কমে গেছে। শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এক সময় সিলেটে পাহাড় টিলায় প্রচুর বেত পাওয়া যেত। স্থানীয় নাম জালি বেত, গল¬া বেত, অন্না বেত প্রচুর পরিমাণ সিলেটে পাওয়া যেত। কিন্তু পাহাড় টিলা কেটে ফেলায় সিলেটের বেত বন উজাড় হয়ে গেছে। তাই পর্যাপ্ত বেত না পাওয়াতে এই শিল্পটি এখন হুমকির মুখে।
মাত্র পাঁচ-ছয় বছর আগেও সিলেটে বেতের আসবাপত্রের দোকান ছিল শতাধিক। এখন সেই বেতশিল্পের দোকান যেমন কমেছে, সাথে শ্রমিকের সংখ্যাও কমে গেছে। শ্রমিকরা আর্থিক সংকটে পড়ে ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন।
সিলেটে বর্তমানে কয়েকটি দোকানে প্রায় ৫০ প্রকারের বেত জাতীয় পণ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য হচ্ছে- বেতের তৈরি ম্যাগাজিন র‌্যাক, টেলিফোন চেয়ার, সোফা সেট, বেড সেট, স্যুজ রেক, ট্রলি, টেবিল, সেলফ, রিডিং টেবিল, রকিং চেয়ার, টেলিফোন টেবিল, ফোল্ডিং চেয়ার, আর্ম চেয়ার, রাউন্ড কফি টেবিল, কর্ণার সোফা এন্ড ইজি চেয়ার, ফুল ইজি চেয়ার, ডাইনিং সেট, টি ট্রলি, গার্ডেন চেয়ার, পেপার বাস্কেট, বুক সেলফ, ম্যাগাজিন বাস্কেট, ডাইনিং চেয়ার, বাঙ্গি টেবিল, কোর্ট হ্যাঙ্গার, মোড়া, বেবি কট, বোতল র‌্যাক ও প¬্যান্টার। এর বেশিরভাগই ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয় এই বেত সামগ্রী।
এখনও এই ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সিলেটে আবার বেত উৎপাদন করলে বছর দশেকের মধ্যে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এতে বেতের তৈরি আসবাবপত্র রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

  •